আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার
প্লাস্টিক আমাদের জীবনশৈলীকে বহুলাংশে বদলে দিয়েছে, বদলে দিয়েছে বিশ্বকেও। সকালে দাঁতব্রাশ থেকে শুরু করে সারা দিনে যা কিছু ব্যবহার করা হয়, তার অধিকাংশই প্লাস্টিক।
প্লাস্টিক জৈব প্রক্রিয়ায় পচনশীল নয়। প্লাস্টিক বোতল প্রকৃতিতে প্রায় ৪৫০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকে। সম্প্রতি দেশে আশঙ্কাজনক হারে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার বাড়ছে।
রাজধানীতে বছরে মাথাপিছু প্রায় ২৩ কেজি প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়। প্লাস্টিকের ব্যবহার জীবনযাপনের অনেক কাজ সহজ করলেও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
নানা ধরনের ব্যবহার্য প্লাস্টিক দ্রব্যের বেশির ভাগই ‘সিংগল ইউজ, যা এক বার ব্যবহার করা হয়। প্লাস্টিক উন্মুক্ত প্রকৃতিতে রোদ, জল ও বাতাসের প্রভাবে ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়।
২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, কালো রঙের প্লাস্টিকে ব্রোমিনের মাত্রা সর্বোচ্চ। কালো রঙের প্লাস্টিকের মাধ্যমে শরীরে পলিব্রমিনেটেড ডাইফিনাইল ইথারের পরিমাণ বেড়ে যায়। এ উপাদান বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের জন্য দায়ী। ফলে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত।
আজকাল অনলাইন খাবার ডেলিভারিতে কালো প্লাস্টিকের বাক্স ব্যবহার করা হয়, যার মধ্যে কিছু ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে। খাবার পণ্যে প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যবহার পেটের রোগ, লিভারের সমস্যা, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ক্যানসারের জন্যও দায়ী। বেশি প্রভাব ফেলে পাকস্থলী, কিডনি ও হার্টের ওপর।
সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে বছরে ৩.১৫ বিলিয়ন থেকে ৩.৮৪ বিলিয়ন প্লাস্টিক বোতল ব্যবহার করা হয়, যার মধ্যে মাত্র ২১.৪ শতাংশ রিসাইকেল করা হয়, বাকি ৭৮.৬ শতাংশ দূষণ সৃষ্টি করছে।
প্লাস্টিক বর্জ্যে ঢেকে যাচ্ছে পৃথিবীর মাটি, নদী ও সাগর; বাতাসেও ভাসছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। মাত্রাতিরিক্ত প্লাস্টিক ব্যবহার দেশের পরিবেশকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দিয়েছে। মাটি দূষণসহ পরিবেশের স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
প্লাস্টিক মাটির সঙ্গে সহজে মেশে না; উলটো মাটির গুণাগুণ নষ্ট করছে এবং জমির উর্বরাশক্তি কমিয়ে দিচ্ছে। তাতে খাদ্যশস্য উৎপাদন আশানুরূপ হচ্ছে না।
তাছাড়া প্লাস্টিক বর্জ্য মাটিতে আটকে পানি ও প্রাকৃতিক পুষ্টি উপাদান চলাচলে বাধা দেয়। এতে মাটিতে থাকা অণুজীবগুলোর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে না, মাটির উর্বরতা হ্রাস পায় ও শস্যের ফলন কম হয়।
ঢাকা শহরে প্রতিদিন প্রায় ১৪ মিলিয়ন পলিথিন ব্যাগ যেখানে-সেখানে ফেলা হয়, যার শেষ ঠিকানা নদীনালা। এভাবে প্রতিবছর ১৮ বিলিয়ন পাউন্ড প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে চলে যায়। এভাবে চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রে জলজ প্রাণীর চেয়ে প্লাস্টিকের পরিমাণ বেশি থাকবে।
প্লাস্টিক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়, যা মাছের মাধ্যমে আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে। শুধু জলজ প্রাণীই নয়, সামুদ্রিক পাখির ওপরও এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। সামুদ্রিক পাখির পেটেও পাওয়া গেছে প্লাস্টিক। কারণ তারা সমুদ্রে ভাসমান মাছ ও প্লাস্টিক ব্যাগ আলাদা করতে পারে না।
পৃথিবীকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে। ১৯০৭ সালে লিয়ো বেকল্যান্ড যখন কৃত্রিম প্লাস্টিক আবিষ্কার করেন, তখন তিনি নিশ্চয়ই ভাবেননি, তার এই আবিষ্কার সভ্যতার এত বড় সংকট হয়ে দেখা দেবে।