গাছ লাগিয়ে সুন্দরবন রক্ষা করতে হবে
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন বলেছেন, সুন্দরবন সুরক্ষায় বনের ৫২ শতাংশ এলাকাকে রক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং সেখান থেকে সব ধরনের বনজ সম্পদ আহরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদের পার্লামেন্ট মেম্বার্স ক্লাবে সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন আয়োজিত ‘জলবায়ু সংকট-দারিদ্র্য-বিপদাপন্নতা দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে মানবিক বিপর্যয় রোধে সমন্বিত উদ্যোগ চাই’ শীর্ষক এক জাতীয় সংলাপে এসব কথা বলেন তিনি।
শাহাব উদ্দিন বলেন, সুন্দরবনের বাঘ, হরিণ, ডলফিন, কুমিরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী রক্ষায় তাদের জন্য অভয়ারণ্য এলাকা ঘোষণাসহ নানা কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার।
এছাড়াও উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় তৃণমূল পর্যায়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মানব সম্পদ উন্নয়ন সংক্রান্ত প্রকল্প বা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে উপযুক্ত কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। উপকূলীয় সুন্দরবনের ভেতরে বিভিন্ন বনজীবী, বনকর্মী ও বন্যপ্রাণীর খাবার পানির জন্য ৪টি নতুন পুকুর ও ৮৪টি পুকুর পুনঃখনন করা হয়েছে।
বনমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন উপকূলীয় এলাকায় বেশি করে গাছ লাগাতে হবে, সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে। জাতির পিতার নির্দেশিত পথ অনুসরণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার সুন্দরবনসহ উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে।
প্রাকৃতিক বড় জলোচ্ছ্বাসের সময় উপকূলীয় এলাকার মানুষের জানমাল রক্ষায় সরকার উপকূল জুড়ে ব্যাপক বনায়নের মাধ্যমে গ্রিনবেল্ট সৃষ্টির কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, উপকূলীয় এলাকায় এ যাবৎ ২ হাজার ২৭৭ বর্গকিলোমিটার চর বনায়ন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় জনগণের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু সহিষ্ণু প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করা হয়েছে। এ ফান্ডের অর্থায়নে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০০ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপকূলীয় অঞ্চলের ভুক্তভোগীরা বলেন, আমাদের খাওয়ার জন্য মিঠা পানি সংগ্রহ করতে হয় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে।
যেটা আমাদের জন্য অনেক কষ্টের একটা বিষয়। দিনের অনেকটা সময় পার হয় এই খাবার পানি সংগ্রহ করতে। আমরা মাঝেমধ্যে খাওয়ার জন্য ড্রামে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করার চেষ্টা করি।
তারা আরও বলেন, আমাদের যে বাধাগুলো, সেগুলো তেমন উঁচু ও শক্ত না। মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে আমাদের দাবি, বাঁধগুলো যেন টেকসই ও আরও উঁচু করে বানানো হয়।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের আহসান ওয়াহিদ বলেন, শুধু নারী ও শিশুদের প্রাধান্য দিলে হবে না। ওই অঞ্চলের প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রাধান্য দিতে হবে। তাদের বিশেষভাবে সহায়তা করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে এটা ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই বলে গেছেন।
গাছ লাগিয়ে সুন্দরবন রক্ষা করতে হবে। অনেক অঞ্চলের বেড়িবাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ছে। সেগুলোকে শক্ত সামর্থ্যভাবে তৈরি করতে হবে। প্রকৃতি ও পরিবেশকে বৈজ্ঞানিকভাবে বুঝতে হবে, না হলে এটার কোনো কার্যকারিতা আমাদের জন্য হবে না।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন লিডার্সের নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মন্ডল। তিনি বিভিন্ন উপাত্ত তুলে ধরে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল সুরক্ষায় ৯টি দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলো হচ্ছে—
- ১. সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলাকে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ বা দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করতে হবে
- ২. দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষার জন্য বিশেষ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ দিতে হবে
- ৩. জলবায়ু ঝুঁকি, দারিদ্র্য ও বিপদাপন্নতার মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার অধীন উপকূল সংশ্লিষ্ট উপজেলাগুলোতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা আনা ও পরিধি বাড়াতে হবে
- ৪. উপকুলীয় এলাকায় একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের আদলে একটি বাড়ি একটি শেল্টার কার্যক্রম শুরু করতে হবে। বর্তমানের সাইক্লোন শেল্টারগুলো সংস্কার, নারী ও শিশুবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে
- ৫. জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ মাথায় রেখে স্থায়ী ও মজবুত বেড়িবাঁধ পুনঃনির্মাণ করতে হবে ও দ্রুততার সঙ্গে ভঙ্গুর স্লইচগেট মেরামত করতে হবে
- ৬. উপকূলীয় সব মানুষের খাবার পানির টেকসই ও স্থায়ী সমাধান করতে হবে
- ৭. আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় সাধনে উপকূল উন্নয়ন বোর্ড গঠন করতে হবে
- ৮. ঝড়, নদীভাঙন ও ভূমিক্ষয় ঠেকাতে উপকূল, দ্বীপ ও চরাঞ্চলে ব্যাপকহারে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ
- ৯. প্যারাবন বা সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে। উপকূলের রক্ষাকবচ সুন্দরবন রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সভাপতি নিখিল চন্দ্র ভদ্রের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংলাপে আরও বক্তব্য রাখেন পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার, সাতক্ষীরা-২ আসনের সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবি, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দা রুবিনা আক্তার ও গ্লোরিয়া ঝর্ণা সরকার প্রমুখ।