পরিবেশ দূষণের সমাধান অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত
অর্থনীতির ভাষায় দূষণকে সংজ্ঞায়িত করা হয় বাজার ব্যর্থতা হিসেবে। সব ধরনের পরিবেশ দূষণের মনুষ্যসৃষ্ট কারণ অর্থনৈতিক। আবার পরিবেশ দূষণের সমাধান অর্থনীতি ও রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। দূষণরোধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক সদিচ্ছারও প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, বায়ু দূষণ ও নদী দূষণের মতো প্লাস্টিক দূষণ ও বর্তমান সময়ের অন্যতম সংকট। কিন্তু ১৯০৭ সালে প্রথম বার বেলজিয়ান বিজ্ঞানী লিও বাকেল্যান্ড যখন সিনথেটিক পলিমার তৈরি করে, তখন ধারণা করা হয়েছিল প্লাস্টিক পৃথিবীকে পাল্টে দিবে।
সাশ্রয়ী ও স্থায়িত্ব বিবেচনায় প্লাস্টিককে মনে করা হয়েছিল প্রাকৃতিক কাঁচামালের অন্যতম বিকল্প, যা প্রাকৃতিক সম্পদের অতি আহরণ কমাবে। হয়েছিলও তাই।
রান্না ঘর থেকে শুরু করে উড়োজাহাজ, সব ক্ষেত্রেই স্টিল, কাঠের বিকল্প হিসেবে শুরু হয়েছিল প্লাস্টিকের ব্যবহার। তাই ১৯৫০ সালের পরবর্তী সময়কে অনেক গবেষক প্লাস্টিক এজ বলেও অভিহিত করে থাকেন।
কিন্তু ক্রমান্বয়ে প্লাস্টিক বর্জ্য হয়ে ওঠে ধরিত্রীর গলার কাঁটা। প্লাস্টিক দূষণ আজ এমন অবস্থায় এসেছ যে মানুষের ভ্রূণেও দেখা মিলছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের। বর্তমানে বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৪০০ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হয়, যার শেষ পরিণতি নদী, খাল, বিল, জলাশয়, সমুদ্র, পাহাড়, পর্বত, বন।
প্লাস্টিক আবিষ্কারের শত বছর পরে এসে প্লাস্টিকই অন্যতম বড় মনুষ্যসৃষ্ট দূষণ সমস্যা। প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় বাজারভিত্তিক দূষণ নীতির অনুপস্থিতি, প্লাস্টিক রিসাইক্লিং শিল্পের অপ্রতুলতা ও সচেতনতার অভাব বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে প্লাস্টিক দূষণকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
অর্থনীতির চাকা সচল রেখে, পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখতে সারা বিশ্বে দূষণ প্রতিরোধে মোটা দাগে ২ ধরনের পদ্ধতির প্রচলন দেখা যায়। ‘কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল’ পদ্ধতি এবং বাজারভিত্তিক বা অর্থনৈতিক পদ্ধতি।
সব থেকে বেশি ব্যবহৃত ‘কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল’ পদ্ধতি এমন এক ব্যবস্থা যেখানে সরকার বা নীতিনির্ধারকেরা আইন বা নীতিমালা করে পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের মানমাত্রা নির্দিষ্ট করে দেয়।
বাংলাদেশে যেমন পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ২০২৩। কোন প্রকার শিল্পে তরল বর্জ্য পরিশোধনে, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কী প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, তা এই পদ্ধতির আওতায় নির্দিষ্ট করা থাকে।
এখন কোনো শিল্প-কারখানা যদি নির্ধারিত মাত্রার থেকে বেশি দূষিত বর্জ্য প্রকৃতিতে ছেড়ে দেয়, সেক্ষেত্রে তাদের জরিমানা করা হয়, ক্ষেত্র বিশেষে পরিবেশ ছাড়পত্র বাতিলও করা হয়। এটাই ‘কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল’ পদ্ধতির নিয়ম। বাংলাদেশ দূষণ মোকাবিলায় এই পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল।
বাজারভিত্তিক ব্যবস্থায় আরেকটি জনপ্রিয় পদ্ধতি পলিউশন ট্যাক্স (দূষণ ট্যাক্স) যা পৃথিবীর অনেক দেশে বহুলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দূষণ ট্যাক্স পদ্ধতির মূল ধারণা এসেছে বিখ্যাত ‘পলিউটারস পে প্রিন্সিপাল’ থেকে।
যখন কোনো শিল্প-কারখানা দূষণ করে, তার জন্য সমাজকে একটা ক্ষতির শিকার হতে হয়। ফলে ওই ক্ষতির পরিমাণ দূষণের জন্য যে দায়ী, সে বহন করবে। এই ক্ষতির পরিমাণ ট্যাক্স আকারে দূষণের জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠান থেকে আদায় করা হয়।
যে যত বেশি দূষণের জন্য দায়ী, তার ট্যাক্সের পরিমাণও তত বেশি হবে। ফলে দূষণকারী ট্যাক্স এড়াতে নিজ উদ্যোগে দূষণ মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করবে। এই দূষণ ট্যাক্স কিন্তু সরকারের জন্য বড় একটা রাজস্বের উৎসও হতে পারে।
ডেনমার্কে দূষণ ট্যাক্স জিডিপির প্রায় ৪ ভাগ। মোদ্দাকথা, দূষণ ট্যাক্স ও আর্থিক প্রণোদনা দূষণকারীকে নিজে থেকে দূষণরোধের উপায় খুঁজে বের করতে প্ররোচিত করে।