২০২৫— যে বছর বাংলাদেশ পৃথিবীকে পথ দেখিয়েছে
সফিকুজ্জামান এর বিশেষ ফিফটি-টু-উইকস ফিচার,
ঢাকা, ০৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
২০২৫ সালকে যখন ইতিহাসের পাতায় মূল্যায়ন করা হবে, তখন একে কেবল একটি ক্যালেন্ডারের একটি পাতা পরিবর্তন বা পঞ্জিকাবর্ষ হিসেবে দেখা হবে না; বরং দেখা হবে বাংলাদেশের ‘বাস্তুসংস্থানিক সার্বভৌমত্ব’ (Ecological Sovereignty) অর্জনের বছর অথবা ‘বাস্তুসংস্থানিক নবজাগরণ’ (Ecological Renaissance) বা পরিবেশগতভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর বছর হিসেবে। জলবায়ু পরিবর্তনের চিরন্তন ‘শিকার’ (Victim) হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ ২০২৫ সালে এসে নিজেকে একজন ‘নেতা’ (Leader) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ, ২০২৫ সালে বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে যে সঠিক নীতি, কঠোর আইন এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলে কীভাবে একটি বদ্বীপ তার হারিয়ে যাওয়া সবুজ ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করতে পারে। সারা বছর ধরে চলা প্লাস্টিক বিরোধী যুদ্ধ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির গণজাগরণ এবং সুন্দরবন রক্ষায় প্রযুক্তির অমোঘ ব্যবহার—সব মিলিয়ে ২০২৫ ছিল বাংলাদেশের জন্য এক সবুজ বসন্ত।
২০২৫ সালের সেই বিশাল পরিবর্তনগুলোর একটি বিস্তারিত খতিয়ান তুলে ধরা হলো যা বাংলাদেশের পরিবেশগত চেহারা চিরতরে বদলে দিয়েছে।
প্লাস্টিকের বিষবলয় থেকে মুক্তি—একটি জাতীয় শপথ

২০২৫ সালের শুরু থেকেই বাংলাদেশের প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল ‘সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক’ বা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিককে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই অভিযান ছিল স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত শুদ্ধি অভিযান।
পলিথিন বিরোধী ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি
নভেম্বর ২০২৪-এ শুরু হওয়া অভিযানের পূর্ণ প্রতিফলন দেখা যায় ২০২৫-এর প্রথমার্ধে। সারা দেশে প্রায় ৭৪৮টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। অভিযানে প্রায় ২৯২ মেট্রিক টন নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দ করা হয় এবং প্রায় ৮৭.৬ লক্ষ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। সাতটি অবৈধ পলিথিন কারখানার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সেগুলো স্থায়ীভাবে সিলগালা করে দেওয়া হয়।
সচিবালয় থেকে সেন্ট মার্টিন—প্লাস্টিক মুক্ত অঞ্চল
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশ সচিবালয়কে সম্পূর্ণ ‘প্লাস্টিক মুক্ত অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই সিদ্ধান্তটি ছিল একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক বার্তা। এর পরপরই পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় ৬-দফা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
দ্বীপে প্লাস্টিক নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা এবং পর্যটকদের সংখ্যা সীমিত করার ফলে ২০২৫-এর শেষে দেখা যায় দ্বীপটির কোরাল প্রাচীর ও সামুদ্রিক কাছিমদের প্রজনন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
পলিথিন মুক্ত বাংলাদেশ: একটি অসম্ভব স্বপ্নের বাস্তবায়ন
২০২৪ সালের শেষ দিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান যে লড়াইয়ের ডাক দিয়েছিলেন, ২০২৫ সালে তা একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয়। দীর্ঘ দুই দশক ধরে কাগজে কলমে থাকা পলিথিন নিষেধাজ্ঞা ২০২৫ সালে এসে প্রথমবার আক্ষরিক অর্থেই কার্যকর হয়।
অভিযানের গভীরতা ও সংখ্যাতত্ত্ব
২০২৫ সালের পুরো বছরে সারা দেশে ৩,৫০০ টিরও বেশি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে প্রায় ৪,৫০০ মেট্রিক টন নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দ করা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে উৎপাদন পর্যায়ে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের আশেপাশের প্রায় ৮০টি অবৈধ পলিথিন কারখানা স্থায়ীভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং মালিকদের বিরুদ্ধে পরিবেশ আইনে জামিন অযোগ্য মামলা দেওয়া হয়েছে।
সোনালী ব্যাগের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন
পলিথিনের বিকল্প কী—এই চিরন্তন প্রশ্নের উত্তর ২০২৫ সালে বাণিজ্যিক রূপ পেয়েছে। বিজ্ঞানী ড. মোবারক আহমদ খানের উদ্ভাবিত পাটের তৈরি ‘সোনালী ব্যাগ’ ২০২৫ সালে সরকারি বড় আকারের কারখানায় উৎপাদনে যায়।
বেসরকারি খাতে প্রায় ১২টি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান পাট থেকে পচনশীল ব্যাগ তৈরির জন্য শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ দেশের সুপারশপগুলোতে পলিথিনের জায়গা দখল করে নিয়েছে পাটের তৈরি সোনালী ব্যাগ ও কাপড়ের থলে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির নবদিগন্ত—নীতি ২০২৫
২০২৫ সালের ২৩ জুন বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা করে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে আধুনিক ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫’। যেখানে ২০৪১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ৪০% নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ফ্লোটিং সোলার ও গ্রিন হাইড্রোজেন
২০২৫ সালে কাপ্তাই হ্রদ এবং দেশের বড় বড় জলাশয়গুলোতে ‘ফ্লোটিং সোলার’ বা ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়েছে। ফসলি জমির অভাব মেটাতে জলাশয়কে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করার এই প্রযুক্তি বাংলাদেশের জন্য গেম-চঞ্জার প্রমাণিত হয়েছে।
একই সাথে প্রথমবারের মতো ‘গ্রিন হাইড্রোজেন’ বা সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদনের জন্য একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়, যা ভবিষ্যতে ভারী শিল্পের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
সৌর উদ্যান ও গ্রিড আধুনিকায়ন
২০২৫ সালে পায়রা, মোংলা এবং সোনাগাজীতে বিশাল সৌর পার্ক বা সোলার পার্কগুলোর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ বাংলাদেশের গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুতের ক্ষমতা প্রায় ৫০০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়, যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ।
জ্বালানি বিপ্লব: কয়লা থেকে সৌরশক্তির রূপান্তর
২০২৫ সাল ছিল বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের জন্য একটি ‘ইউ-টার্ন’। সরকার নীতিগতভাবে ঘোষণা করেছে যে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আর কোনো নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে না।
ভাসমান সৌরবিদ্যুতের জয়জয়কার
ফসলি জমির অভাব মেটাতে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ বিশ্বকে দেখিয়েছে কীভাবে জলাশয় ব্যবহার করতে হয়। কাপ্তাই হ্রদে স্থাপিত ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র ২০২৫ সালে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন শুরু করেছে। এছাড়াও উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্য ঘেরগুলোর ওপর সোলার প্যানেল বসিয়ে ‘এগ্রি-ভোল্টাইক’ প্রযুক্তির মাধ্যমে একই সাথে মাছ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক নতুন দিগন্ত খুলেছে।
বায়ু শক্তি ও গ্রিন হাইড্রোজেন
কক্সবাজার ও মোংলার উপকূলে ২০২৫ সালে নতুন পাঁচটি বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্র (Wind Farm) কাজ শুরু করেছে। একই সাথে সমুদ্রের জল থেকে হাইড্রোজেন বের করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের ‘গ্রিন হাইড্রোজেন পাইলট প্রকল্প’ ২০২৫ সালে সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। এর ফলে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট গ্রিড বিদ্যুতের প্রায় ১৫% এসেছে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে।
সোনালী আঁশের রূপান্তর—সোনালী ব্যাগ ও জুট বায়োপলিমার
প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে ২০২৫ সালে বিশ্ববাজার কাঁপিয়েছে বাংলাদেশের উদ্ভাবন—সোনালী ব্যাগ। বিজ্ঞানী ড. মোবারক আহমদ খানের এই উদ্ভাবন ২০২৫ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদনের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়।
অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও শিল্পায়ন
সরকার ২০২৫ সালে সোনালী ব্যাগ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ১০% ট্যাক্স হলিডে ঘোষণা করে। বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন (BJMC) এবং বেসরকারি খাতের যৌথ বিনিয়োগে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৫টি বড় আকারের সোনালী ব্যাগ তৈরির কারখানা চালু হয়। ২০২৫ সালের শেষে এই ব্যাগগুলো স্থানীয় সুপারশপ ছাপিয়ে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে রপ্তানি হতে শুরু করে।
কৃষকের মুখে হাসি
পাটের বহুমুখী ব্যবহারের কারণে ২০২৫ সালে পাটের বাজারমূল্য প্রায় ৩০% বৃদ্ধি পায়। প্রায় ১৫ লক্ষ পাটচাষী সরাসরি এই পরিবেশবান্ধব বিপ্লবের সুফল ভোগ করতে শুরু করেন। ২০২৫ সালটি আক্ষরিক অর্থেই পাটকে পুনরায় ‘সোনালী আঁশ’-এ রূপান্তরিত করেছে।
অরণ্য পুনরুদ্ধার—বেদখল হওয়া ভূমির মুক্তি
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালটি ছিল বনাঞ্চল উদ্ধারের বছর। দেশের ১৯টি জেলায় পাহাড় ও বনভূমি থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়।
মধুপুর ও চুনতির পুনর্জন্ম
২০২৫ সালের জুন মাসের মধ্যে প্রায় ৫০০০ একর বনভূমি সফলভাবে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো মধুপুর শালবন পুনরুদ্ধার প্রকল্প। ৬৬১০ একর জমিতে নতুন করে বন সৃজন শুরু করা হয়েছে।
অন্যদিকে, দক্ষিণবঙ্গের চুনতি বনে বন্য হাতিদের আবাসন রক্ষার জন্য ১৪.৭৬ কোটি টাকার একটি বিশেষ প্রকল্প চালু করা হয়েছে, যা বন্যপ্রাণী ও মানুষের সংঘাত কমিয়ে এনেছে।
নগর পরিবেশ ও শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ
২০২৫ সালে ঢাকার বাসিন্দারা প্রথমবারের মতো অনুভব করেছেন যে শব্দ ও বায়ু দূষণ কমানো সম্ভব।
সাইলেন্ট জোন ও হর্ন মুক্ত সড়ক
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সচিবালয় এলাকাকে ‘সাইলেন্ট জোন’ বা নীরব এলাকা হিসেবে সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হয়। ৪৮৪টি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে প্রায় ১৫.৫ লক্ষ টাকা জরিমানা এবং ১৬৪৪টি নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করা হয়।
বায়ুমান উন্নয়নে কঠোর পদক্ষেপ
শহরের চারপাশে থাকা প্রায় ৪৮৪টি অবৈধ ইটভাটা ২০২৫ সালে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। বায়ুমান উন্নয়নে এয়ার পিউরিফায়ারের ওপর আমদানি শুল্ক ২৫% থেকে কমিয়ে ১০% করা হয়, যাতে সাধারণ মানুষও এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পায়।
নগর সবুজায়ন: ঢাকার বাতাসের মান উন্নয়ন
২০২৫ সালটি ঢাকার বাসিন্দাদের জন্য ছিল স্বস্তির বছর। বছরের বেশির ভাগ সময় ঢাকার বায়ুমান (AQI) সহনীয় পর্যায়ে ছিল।
অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদ
২০২৫ সালে সরকার একটি অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। সারা দেশে থাকা প্রায় ৫০০০ অবৈধ ইটভাটা গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর বদলে পরিবেশবান্ধব ‘ব্লক ব্রিকস’ বা কংক্রিট ব্লকের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই একটি পদক্ষেপেই ঢাকার বায়ু দূষণ প্রায় ৪০% কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
ছাদ বাগান ও আরবান ফরেস্ট্রি
২০২৫ সালে রাজউক তাদের বিল্ডিং কোড সংশোধন করেছে। এখন থেকে যেকোনো বহুতল ভবনের ছাদে অন্তত ২৫% সবুজায়ন থাকা বাধ্যতামূলক। ২০২৫ সালে ঢাকার আকাশ থেকে ড্রোন দিয়ে ছবি তুললে দেখা যায়, ধূসর শহরের ওপর এক সবুজ চাদর বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই ছাদ বাগানগুলোর ফলে ২০২৫ সালে ঢাকার গড় তাপমাত্রা প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম রেকর্ড করা হয়েছে।
নীল অর্থনীতি ও বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০
বঙ্গোপসাগরকে ঘিরেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। ২০২৫ সালে ‘ব্লু ইকোনমি’ বা নীল অর্থনীতির কৌশলগত প্রয়োগ শুরু হয়। বাংলাদেশ তার সমুদ্রসীমাকে কেবল মাছ ধরার ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং কার্বন শোষণের এক বিশাল ক্ষেত্র হিসেবে মূল্যায়ন করেছে।
সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষা
বঙ্গোপসাগরের নির্দিষ্ট কিছু এলাকাকে ‘মেরিন প্রটেক্টেড এরিয়া’ (MPA) হিসেবে ঘোষণা করে সেখানে অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ এবং বর্জ্য নিক্ষেপ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর ফলে ইলিশসহ অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন ২০২৫ সালে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়।
ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর মাইলফলক
বদ্বীপ পরিকল্পনা বা ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর অধীনে ২০২৫ সালে নদী খনন এবং উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণের ২৫টি মেগা প্রজেক্ট সম্পন্ন হয়। এর ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা প্রবেশের হার ৫% হ্রাস পেয়েছে, যা কৃষির জন্য এক বিশাল জয়।
সি-উইড বা সামুদ্রিক শৈবাল চাষ
কক্সবাজার ও মহেশখালী উপকূলে ২০২৫ সালে শুরু হয়েছে এক ‘নীল বিপ্লব’। প্রায় ১০ হাজার উপকূলীয় পরিবার এখন বাণিজ্যিকভাবে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ করছে। এই শৈবাল থেকে তৈরি হচ্ছে পরিবেশবান্ধব প্লাস্টিক, প্রসাধনী এবং সার। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ৫০ মিলিয়ন ডলারের শৈবাল আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করেছে।
মহাসাগরীয় সুরক্ষা ও MPA
বঙ্গোপসাগরের ‘সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ড’ এলাকায় ২০২৫ সালে টহল জোরদার করা হয়েছে। এখানে তিমি এবং ডলফিনের অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করতে আধুনিক রাডার সিস্টেম বসানো হয়েছে। সমুদ্রের প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণে ২০২৫ সালে চালু হয়েছে রোবোটিক ক্লিনার, যা চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের আবর্জনা পরিষ্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সুন্দরবন ২০২৫: এআই এবং স্মার্ট পেট্রোলিংয়ের বিপ্লব
সুন্দরবন রক্ষা করার জন্য ২০২৫ সালে যে প্রযুক্তিগত কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, তা দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম। বন্যপ্রাণী পাচার রোধ এবং কাঠের অবৈধ কারবার বন্ধে ‘স্মার্ট সুন্দরবন’ প্রকল্প ২০২৫ সালে পূর্ণতা পায়।
অদৃশ্য পাহারাদার: বায়ো-অ্যাকোস্টিক সেন্সর
২০২৫ সালের মে মাসে সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে ৫০০০টি বায়ো-অ্যাকোস্টিক সেন্সর স্থাপন সম্পন্ন হয়। এই সেন্সরগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) মাধ্যমে বনের প্রতিটি শব্দ বিশ্লেষণ করতে পারে। যদি কোথাও করাতের শব্দ বা বাঘের আর্তনাদ শোনা যায়, তবে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে বন বিভাগের কন্ট্রোল রুমে অ্যালার্ট পৌঁছে যায়। এই প্রযুক্তির ফলে ২০২৫ সালে সুন্দরবনে বাঘ ও হরিণ শিকারের পরিমাণ ৮০% হ্রাস পেয়েছে।
বাঘ শুমারি ২০২৫: খুশির খবর
২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত সর্বশেষ বাঘ শুমারির ফলাফল অনুযায়ী, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৩টি। গত এক দশকে এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা। বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের কঠোর নজরদারি এবং বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের ফলে বাঘের আবাসস্থল এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ।
বর্জ্য থেকে সম্পদ: ঢাকার সার্কুলার ইকোনমি
ঢাকার ময়লার পাহাড় (ল্যান্ডফিল) ২০২৫ সালে এসে অভিশাপের বদলে আর্শীবাদ হতে শুরু করেছে। উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের যৌথ উদ্যোগে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে।
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও জৈব সার
আমিনবাজারে স্থাপিত ২০২৫ সালের নতুন প্ল্যান্টটি এখন প্রতিদিন ৩০০০ টন বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করছে। এই প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত ফিল্টারগুলো বাতাসের বিষাক্ত ধোঁয়াকে বিশুদ্ধ করে ছাড়ে।
এছাড়া পচনশীল বর্জ্য থেকে তৈরি হচ্ছে উচ্চমানের জৈব সার, যা শহরের ছাদবাগান এবং গ্রামীণ কৃষিতে ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্লাস্টিক ব্যাংকিং ও রিফান্ড সিস্টেম
২০২৫ সালে সারা দেশে ‘রিফান্ড সিস্টেম’ চালু হয়েছে। আপনি যদি একটি ব্যবহৃত প্লাস্টিক বোতল নির্দিষ্ট ভেন্ডিং মেশিনে জমা দেন, তবে আপনার ডিজিটাল ওয়ালেটে টাকা জমা হবে।
এই ব্যবস্থার ফলে ২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্লাস্টিক বোতলের রিসাইক্লিং হার ৯৫% ছাড়িয়ে গেছে। রাস্তাঘাটে বোতল পড়ে থাকা এখন অতীত ইতিহাস।
উপকূলীয় রেজিলিয়েন্স: লবণাক্ততা জয় করা কৃষি
২০২৫ সালে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ লবণাক্ততাকে বিজ্ঞানের মাধ্যমে জয় করেছে বাংলাদেশ।
বিপ্লব-২৫: সুপার রাইস
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) ২০২৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারজাত করেছে ‘বিপ্লব-২৫’ নামক এক বিশেষ ধান। এটি এমন জমিতেও বাম্পার ফলন দিচ্ছে যেখানে আগে লবণাক্ততার কারণে কোনো ফসল হতো না। এই ধানের ফলে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের প্রায় ২ লক্ষ হেক্টর জমি পুনরায় চাষাবাদের আওতায় এসেছে।
ম্যানগ্রোভ ওয়াল
২০২৫ সালে উপকূল জুড়ে প্রায় ৩ কোটি কেওড়া ও বাইন গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। একে বলা হচ্ছে ‘প্রাকৃতিক প্রাচীর’। এই গাছগুলো উপকূলকে জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি কয়েক হাজার মেট্রিক টন কার্বন শোষণ করছে। ২০২৫ সালের শেষে দেখা গেছে, উপকূলীয় বনায়ন গত বছরের তুলনায় অন্তত ১২% বেড়েছে।
গ্রিন ইকোনমি ও কার্বন ক্রেডিট: বিশ্বের কাছে উদাহরণ
২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে যে পরিবেশ রক্ষা করা কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি বড় ব্যবসা।
কার্বন ট্রেডিংয়ের যাত্রা
২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে প্রবেশ করেছে। সুন্দরবন এবং উপকূলীয় বনের কার্বন শোষণ করার ক্ষমতাকে পুঁজি করে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছ থেকে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার কার্বন ক্রেডিট বাবদ আয় করেছে। এই অর্থ সরাসরি পরিবেশ রক্ষা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যয় করা হচ্ছে।
গ্রিন বন্ড
বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৫ সালে কয়েক হাজার কোটি টাকার ‘গ্রিন বন্ড’ ইস্যু করেছে। এই বন্ডের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ কেবল পরিবেশবান্ধব শিল্প ও কৃষি প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরে এক নতুন স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে এসেছে।
ডেটা টেবিল: ২০২৫ সালের পরিবেশগত অর্জনের পরিসংখ্যান
| খাত | ২০২৪ সালের অবস্থা | ২০২৫ সালের অর্জন | পরিবর্তনের হার |
| পলিথিন ব্যবহার | ব্যাপক (নিয়ন্ত্রণহীন) | ৮০% হ্রাস | -৮০% |
| সুন্দরবনের বাঘ | ১১৪টি | ১৫৩টি | +৩৪% |
| নবায়নযোগ্য জ্বালানি | ৪% (গ্রিড) | ১৫% (গ্রিড) | +২৭৫% |
| বর্জ্য রিসাইক্লিং | ১৫% | ৬০% | +৩০০% |
| কার্বন আয় | প্রায় শূন্য | ১.৫ বিলিয়ন ডলার | – |
| বায়ু দূষণ (AQI) | ২৫০+ (গড়) | ১৬০ (গড়) | -৩৬% |
উপসংহার: ২০২৫-এর শিক্ষা এবং ২০২৬-এর অঙ্গীকার
২০২৫ সালটি আমাদের শিখিয়েছে যে প্রকৃতিকে শোষণ বা ধ্বংস করে নয়, বরং প্রকৃতির সাথে মৈত্রীর মাধ্যমেই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। বাংলাদেশের মানুষ ২০২৫ সালে যে সচেতনতার পরিচয় দিয়েছে, তা প্রশংসিত এবং বিশ্বদরবারে আমাদের মাথা উঁচু করে দিয়েছে। ২০২৫ সালে আমরা যে বীচ বুনেছি যেমন, পলিথিন মুক্ত বাজার, বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি, এবং লবণাক্ত জমিতে সোনালী ধানের হাসি এসবের ফল আমরা পেতে থাকবো আগামী দশকগুলোতে যা ২০২৫ সালের মহাকাব্যের একেকটি অধ্যায়। সিডনি থেকে জেনেভা—সব জায়গায় আজ বাংলাদেশের ‘গ্রিন মডেল’ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
২০২৬ সালে আমাদের দায়িত্ব এই অর্জনকে ধরে রাখা। আমরা যদি এই গতি ২০২৬ এবং তার পরেও ধরে রাখতে পারি, তবে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের প্রথম প্রকৃত ‘গ্রিন ইকোনমি’।
বাংলাদেশ এখন আর জলবায়ু পরিবর্তনের অসহায় শিকার নয়; বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর পরিবেশ রক্ষার এক সাহসী সেনাপতি।
