জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃষিজ বর্জ্যের প্রভাব : আটলান্টিকের দানবীয় শৈবাল বেল্ট
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে আটলান্টিক মহাসাগরে এক অভূতপূর্ব প্রাকৃতিক সংকটের চিত্র ফুটে উঠেছে। ফ্লোরিডা আটলান্টিক ইউনিভার্সিটির গবেষকরা জানিয়েছেন, ‘গ্রেট আটলান্টিক সারগাসাম বেল্ট’ (Great Atlantic Sargassum Belt) নামক একটি বিশাল সামুদ্রিক শৈবালের স্তর এখন রেকর্ড ৩৭.৫ মিলিয়ন টনে পৌঁছেছে।
এই দানবীয় শৈবাল স্তরটি পশ্চিম আফ্রিকা থেকে মেক্সিকো উপসাগর পর্যন্ত প্রায় ৮,৮৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। যদিও সারগাসাম শৈবাল সামুদ্রিক মাছ ও কচ্ছপের জন্য প্রাকৃতিক বাসস্থান হিসেবে কাজ করে, কিন্তু এর অতিরিক্ত বৃদ্ধি এখন মহাসাগরের বাস্তুসংস্থান এবং উপকূলীয় অর্থনীতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির মূল কারণ দুটি: প্রথমত, আমাজন এবং কঙ্গো নদীর অববাহিকা থেকে আসা কৃষিজ সার এবং বর্জ্য মিশ্রিত জল, যা শৈবালকে পুষ্টি যোগাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মহাসাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বাতাসের ধরণে পরিবর্তন।
১৯৮০-এর দশকের তুলনায় এই শৈবালে এখন নাইট্রোজেনের পরিমাণ ৫০% বেশি পাওয়া গেছে, যা সরাসরি মানুষের তৈরি দূষণের প্রমাণ। এই শৈবালের স্তূপ যখন সমুদ্র সৈকতে জমা হয়, তখন তা পচে দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস নির্গত করে, যা মানুষের শ্বাসকষ্টের কারণ হতে পারে।
পর্যটন এবং মৎস্য শিল্পের ওপর এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ক্যারিবীয় অঞ্চলের অনেক পর্যটন কেন্দ্র এখন এই শৈবালের কারণে বন্ধ হওয়ার পথে। জেলেরা সমুদ্রে জাল ফেলতে পারছেন না, কারণ বিশাল শৈবাল স্তর তাদের নৌকা এবং জালের ক্ষতি করছে। বিজ্ঞানীরা এখন এই শৈবালকে কার্বন সিঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করার কথা ভাবছেন।
সারগাসাম প্রচুর পরিমাণে কার্বন শোষণ করে, কিন্তু এটি যখন পচে যায় তখন সেই কার্বন আবার বাতাসে মিশে যায়। গবেষকরা এখন শৈবালকে গভীর সমুদ্রে ডুবিয়ে দেওয়ার বা এটি থেকে জৈব সার এবং বায়োফুয়েল তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। সমুদ্রের এই উত্থান-পতন আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, স্থলের দূষণ কীভাবে সমুদ্রের বিশাল এলাকাকেও বিষাক্ত করে তুলতে পারে।
