২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘ চার বছরের টানাপোড়েন, করপোরেট লবিং এবং ভূ-রাজনৈতিক বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘ আয়োজিত ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল নেগোশিয়েটিং কমিটি’ (INC-5.3)-এর বিশেষ অধিবেশনে বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক দূষণ বন্ধে একটি আইনগতভাবে বাধ্যকর চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।
চিলির রাষ্ট্রদূত হুলিও কর্দানোর নেতৃত্বে এই অধিবেশনে ১৪০টিরও বেশি দেশ একমত হয়েছে যে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে ‘ভার্জিন প্লাস্টিক’ বা নতুন প্লাস্টিক উৎপাদন অন্তত ৬০ শতাংশ কমিয়ে আনা হবে।
২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ বার্ষিক ৪০০ মিলিয়ন টন ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এর মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ রিসাইকেল করা সম্ভব হচ্ছিল।
বিশেষ করে মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন মানুষের রক্ত, গর্ভফুল এবং গভীর সমুদ্রের মারিয়ানা ট্রেঞ্চেও পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৪ সালের দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান সম্মেলন এবং ২০২৫ সালের জেনেভা (INC-5.2) অধিবেশনের পর একটি কঠোর চুক্তির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হয়ে পড়েছিল।
আমাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই নতুন চুক্তিতে ‘এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপন্সিবিলিটি’ (EPR) বা উৎপাদকের দায়বদ্ধতাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অর্থাৎ, কোকা-কোলা বা ইউনিলিভারের মতো কোম্পানিগুলো যদি তাদের উৎপাদিত বোতল বা প্যাকেট বাজার থেকে পুনরায় সংগ্রহ না করে, তবে তাদের ওপর আন্তর্জাতিকভাবে উচ্চহারে ‘কার্বন ও প্লাস্টিক ট্যাক্স’ আরোপ করা হবে। ২০২৬ সালের এই চুক্তিতে প্রথমবারের মতো ‘কেমিক্যাল রিসাইক্লিং’ প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
এই চুক্তির ফলে বিশ্ববাজারে প্লাস্টিক পণ্যের দাম ইতিমধ্যে ১০-১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এর বিপরীতে বায়ো-প্লাস্টিক এবং জুট-পলিমারের মতো পরিবেশবান্ধব বিকল্পগুলোর বাজার গত ছয় মাসে ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের মতো পাটের দেশে এই চুক্তি একটি বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. এলেনা রদ্রিগেজ বলেন, “এটি কেবল একটি চুক্তি নয়, এটি সমুদ্র এবং মাটির জন্য একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা। আমরা যদি ২০৩০-এর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারি, তবে ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রের প্লাস্টিক মাছের ওজনকে ছাড়িয়ে যাওয়ার যে আশঙ্কা ছিল, তা থেকে রক্ষা পাব।”
