জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক অভিঘাত, তীব্র খরা, এবং নির্বিচারে ভূমি অবক্ষয়ের মুখে বিশ্বের ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে জাতিসংঘ।

মঙ্গোলিয়ার উলানবাটরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ মরুকরণ রোধ সংক্রান্ত কনভেনশনের (UNCCD COP17) উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষায় অসাধারণ অবদান রাখার জন্য ব্রাজিল, আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল এবং সৌদি আরবের তিনটি বড় পরিবেশগত উদ্যোগকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিশ্ব পুনরুদ্ধার ফ্ল্যাগশিপ’ (World Restoration Flagships) হিসেবে পুরস্কৃত করা হয়েছে।
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) যৌথ উদ্যোগে ‘জাতিসংঘ বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার দশক (২০২১–২০৩০)’ কর্মসূচির আওতায় এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
পুরস্কৃত উদ্যোগসমূহ ও পরিবেশগত রূপরেখা:
বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান খরা ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় এই তিন মেগা উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ৫ মিলিয়ন হেক্টর (প্রায় ৭০ লক্ষ ফুটবল মাঠের সমান) অবক্ষয়িত ভূমি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে:
-
ব্রাজিলের অবক্ষয়িত ভূমি পুনরুদ্ধার: আমাজন ও আটলান্টিক ফরেস্টের সংলগ্ন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে দেশীয় প্রজাতির গাছ রোপণ এবং প্রাকৃতিক উপায়ে বনভূমি ফিরিয়ে আনার কাজ চলছে, যা কার্বন শোষণ বাড়াতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
-
সাহেল ইন্টিগ্রেটেড রেজিলিয়েন্স ইনিশিয়েটিভ: যুদ্ধবিগ্রহ, খরা এবং চরম খাদ্য সংকটে জর্জরিত আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে (বুর্কিনা ফাসো, শাদ, মালি, মৌরিতানিয়া ও নাইজার) পরিবেশ পুনরুদ্ধার ও জলবায়ু সহনশীল কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে ইতিমধ্যে তিন লক্ষাধিক হেক্টরের বেশি ভূমি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
-
সৌদি আরবের সবুজায়ন কর্মসূচি: দেশটির জাতীয় উদ্ভিদ আচ্ছাদন উন্নয়ন ও মরুকরণ রোধ কেন্দ্রের নেতৃত্বে মরুভূমি এলাকায় প্রায় ১ মিলিয়ন হেক্টর অবক্ষয়িত ভূমি পুনরুদ্ধার এবং ১৫ কোটি ৯০ লক্ষেরও বেশি গাছ রোপণ করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং বর্জ্য পানি পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে এই শুষ্ক অঞ্চলে দেশীয় বন্যপ্রাণী যেমন আরবীয় ওরিক্স ও গাজেলের পুনর্র্বাসন নিশ্চিত করা হয়েছে।
ক্ষুদ্র ও বৃহৎ বাস্তুতন্ত্রের সংকট এবং বৈশ্বিক গুরুত্ব: সম্মেলনে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, ভূমি অবক্ষয়, খরা এবং বাস্তুতন্ত্রের ধ্বংস এখন আর কেবল সাধারণ পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি মানবজাতির খাদ্য নিরাপত্তা, সুপেয় পানি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সামনে সবচেয়ে বড় হুমকি।
২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী মোট ১ বিলিয়ন হেক্টর অবক্ষয়িত ভূমি পুনরুদ্ধারের যে বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, এই উদ্যোগগুলো তাতে সরাসরি অবদান রাখছে।
উপসংহার ও গ্রিনপেজ দৃষ্টিভঙ্গি: প্রকৃতির ধ্বংসলীলা রোধে কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং মাঠপর্যায়ে সফল ও বিজ্ঞানসম্মত পুনরুদ্ধার কাজই পারে পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে।
গ্রিনপেজ বিশ্বাস করে, সৌদি আরব বা সাহেল অঞ্চলের মতো শুষ্ক ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান এবং সুদূরপ্রসারী উদ্যোগগুলো বিশ্বজুড়ে অন্যান্য দেশের জন্যও এক অনন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
