২০২৫ সালের শেষে ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত কপ-৩০ (COP30) সম্মেলনের রেশ ধরে ২০২৬ সালের শুরুতেই বিশ্বব্যাপী এক নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। ইতিহাসের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী এবং আইনগতভাবে বাধ্যকর ‘গ্লোবাল প্লাস্টিক ট্রিটি’ বা ‘বেলেম ঘোষণা’ এখন পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের পথে।
এই চুক্তিকে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির পর পরিবেশ রক্ষার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো ২০৪০ সালের মধ্যে বিশ্বে নতুন প্লাস্টিক উৎপাদন ৭৫% কমিয়ে আনা এবং ২০২৬ সাল থেকে একক ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক (Single-use Plastic) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা।
এই ঐতিহাসিক চুক্তির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল উন্নত দেশ এবং প্লাস্টিক উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। ২০২৬ সালের এই নতুন নীতিমালায় প্লাস্টিককে কেবল বর্জ্য হিসেবে নয়, বরং একটি ‘রাসায়নিক হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এর ফলে এখন থেকে যেকোনো প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিকে তাদের পণ্যের সম্পূর্ণ জীবনচক্রের (Life cycle) দায়ভার নিতে হবে। একে বলা হচ্ছে ‘এক্সটেন্ডেড প্রোডিউসার রেসপন্সিবিলিটি’ (EPR)।
এর মাধ্যমে কোম্পানিগুলো বাধ্য হবে তাদের উৎপাদিত প্লাস্টিক বাজার থেকে সংগ্রহ করে পুনরায় প্রক্রিয়াজাত করতে অথবা পরিবেশবান্ধব বিকল্প খুঁজে বের করতে।
বেলেম ঘোষণার আরেকটি বৈপ্লবিক দিক হলো ‘গ্লোবাল প্লাস্টিক ট্যাক্স’। ২০২৬ সালের মার্চ মাস থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যেসব পণ্যে ভার্জিন প্লাস্টিক (নতুন প্লাস্টিক) ব্যবহার করা হবে, সেগুলোর ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হবে। এই কর থেকে প্রাপ্ত অর্থ উন্নয়নশীল দেশগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সমুদ্র পরিষ্কার অভিযানে ব্যয় করা হবে।
প্রশান্ত মহাসাগরের ‘গ্রেট প্যাসিফিক গার্বেজ প্যাচ’ পরিষ্কার করার জন্য একটি বিশেষ আন্তর্জাতিক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে, যারা ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে তাদের প্রথম বড় অভিযান শুরু করবে।
তবে এই চুক্তির ফলে বিশ্বজুড়ে প্যাকেজিং শিল্পে এক বিশাল রূপান্তর শুরু হয়েছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে এখন মাশরুম-ভিত্তিক প্যাকেজিং, সি-উইড (সামুদ্রিক শৈবাল) থেকে তৈরি বায়ো-প্লাস্টিক এবং পুনরায় ব্যবহারযোগ্য কাঁচের বোতলের চাহিদা তুঙ্গে।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এমন সব এআই-চালিত রোবট তৈরি করছে যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ময়লার ভাগাড় থেকে প্লাস্টিক আলাদা করতে পারে।
পরিবেশবাদীরা এই চুক্তিকে স্বাগত জানালেও সতর্ক করেছেন যে, যথাযথ মনিটরিং এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। ২০২৬ সালটি তাই প্লাস্টিক বনাম পৃথিবীর লড়াইয়ের এক চূড়ান্ত বছর হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
