প্রকৃতির ক্ষত সারাতে ইউরোপের ঐতিহাসিক উদ্যোগ: ‘নেচার রেস্টোরেশন ল’ এনে বিশ্বজুড়ে রোল মডেল ইইউ
ভূমিকা: মানব সভ্যতার আধুনিকায়ন এবং শিল্পায়নের চাপে বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থান বা ইকোসিস্টেম আজ ধ্বংসের মুখে। এতদিন ধরে পরিবেশ সংরক্ষণের নীতিগুলো কেবল বিদ্যমান বন বা নদীকে ‘রক্ষা করার’ (Conservation) মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
কিন্তু এই গতানুগতিক ধারায় পরিবর্তন এনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) সম্প্রতি একটি যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক আইন পাস করেছে, যার নাম ‘নেচার রেস্টোরেশন ল’ (Nature Restoration Law)। এটি বিশ্বের প্রথম কোনো মহাদেশীয় আইন, যার মূল লক্ষ্য কেবল বন্য প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা নয়, বরং মানবসৃষ্ট কারণে গত কয়েক দশকে ধ্বংস হয়ে যাওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত ইকোসিস্টেমগুলোকে আইনগত বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে পুনরায় তাদের পূর্বের স্বাভাবিক রূপে ফিরিয়ে আনা।
আইনের লক্ষ্য ও সুনির্দিষ্ট সময়সীমা: ইউরোপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে ফিরিয়ে আনতে এই নতুন আইনে কিছু কঠোর ও সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে:
- ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ পুনরুদ্ধার: আইন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপের মোট স্থল ও জলভাগের অন্তত ২০ শতাংশ এলাকাকে পুনরুদ্ধার করে তাদের প্রাকৃতিক ও জীবন্ত অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে।
- দীর্ঘমেয়াদী রূপরেখা (২০৫০): এই পরিকল্পনা কেবল এই দশকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ২০৫০ সালের মধ্যে ইউরোপ মহাদেশের সমস্ত ক্ষতিগ্রস্ত জলাভূমি, বনভূমি, নদী ও কৃষিজমিকে পুনরুদ্ধারের দীর্ঘমেয়াদী রূপরেখা এই আইনে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধি ও বাস্তুসংস্থানের পুনর্গঠন: ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই আইনের কার্যপরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। এর প্রধান দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফেরানো: কংক্রিটের বাঁধ দিয়ে আটকে দেওয়া এবং শুকিয়ে যাওয়া নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতাগুলো অপসারণ করা।
- জলাভূমি ও পেটল্যান্ড পুনর্গঠন: ইউরোপজুড়ে যে বিশাল জলাভূমিগুলো ড্রেন আউট করে কৃষিজমি বা আবাসন বানানো হয়েছিল, সেগুলোকে পুনরায় প্লাবিত করে প্রাকৃতিক জলাভূমিতে রূপান্তর করা, যা কার্বন শোষণে বিশাল ভূমিকা রাখবে।
- কৃষিজমিতে পরাগায়নকারী ও পাখির আবাসস্থল: অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে ইউরোপের কৃষিজমিতে মৌমাছি ও অন্যান্য কীটপতঙ্গ এবং পাখি বিলুপ্তির মুখে পড়েছে। এই আইনে প্রতিটি দেশের কৃষিজমির অন্তত ১০ শতাংশ এলাকায় জীববৈচিত্র্যবান্ধব সবুজ বেষ্টনী বা গাছপালা রাখার আইনি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে এই আইনের গুরুত্ব ও প্রভাব: পরিবেশবিদ ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু গবেষকদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই ‘নেচার রেস্টোরেশন ল’ কেবল ইউরোপের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই আটকে থাকবে না; এটি বৈশ্বিক পরিবেশ রাজনীতির জন্য একটি শক্তিশালী উদাহরণ তৈরি করেছে। বিশ্বজুড়ে যখন জলবায়ু পরিবর্তন এবং জীববৈচিত্র্যের ধস ঠেকানোর আলোচনা চলছে, তখন প্রকৃতিকে শুধু ‘সংরক্ষণ’ না করে তাকে ‘পুনরুদ্ধার’ করার এই আইনি বাধ্যবাধকতা অন্য দেশগুলোকেও এমন কঠোর আইন প্রণয়নে উদ্বুদ্ধ করবে।
গ্রিনপেজ দৃষ্টিভঙ্গি: প্রকৃতি ধ্বংসের চড়া মূল্য আজ পুরো পৃথিবীকে দিতে হচ্ছে চরম তাপমাত্রা, খরা এবং একের পর এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মাধ্যমে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই যুগান্তকারী আইন প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রকৃতিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
গ্রিনপেজ বিশ্বাস করে, নেচার রেস্টোরেশন ল’ বিশ্ব পরিবেশ রক্ষায় এক নতুন যুগের সূচনা করেছে, যা আগামী দিনে একটি সবুজ, টেকসই এবং প্রাণবন্ত পৃথিবী গড়ে তুলতে মানবজাতিকে পথ দেখাবে।
