গত ২৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে নেপাল ও চীন সীমান্তবর্তী তিব্বত সংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে ঘটা ভয়ংকর হিমবাহ ধস (Glacial Collapse) এবং এর ফলে সৃষ্ট আকস্মিক বিধ্বংসী বন্যার (Flash Flood) ঘটনায় চরম মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।
লাংটাং লিরুং ও ছাংস্বু রি পর্বতমালা সংলগ্ন এলাকায় সংঘটিত এই আকস্মিক বিপর্যয়ে ল्हेन्दे খোলা ও ভोटेकोशी (ভোটকোশি) নদী হয়ে ত্রিসূলী নদীর অববাহিকায় নেমে আসা পানির প্রবল স্রোত পুরো উত্তর ও মধ্য নেপালের বিস্তীর্ণ জনপদ লন্ডভন্ড করে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক আপডেট অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়ে গেছে এবং প্রায় তিন হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
দুর্যোগের তীব্রতা ও ভূতাত্ত্বিক কারণ: মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) এবং আন্তর্জাতিক গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এটি প্রথাগত কোনো মৌসুমী বন্যা ছিল না:
- হিমবাহ ধসের তাণ্ডব: প্রায় ৫,২০০ মিটার উচ্চতা থেকে বিশাল আকৃতির একটি হিমবাহ বা বরফ-শিলার অংশ আকস্মিক ভেঙে পড়ে হাজার হাজার ফুট নিচে উপত্যকায় আছড়ে পড়ে। এর তীব্র গতি ও ঘর্ষণের ফলে মুহূর্তের মধ্যে যে ডেবরিস ফ্লো বা ধ্বংসাবশেষের সৃষ্টি হয়, তাতে নদীর পানি মাত্র আধ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ৯ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করে।
- চীন-নেপাল সীমান্ত বাণিজ্য কেন্দ্র ধ্বংস: নেপালের রসুয়া জেলার চীন সীমান্তসংলগ্ন প্রধান বাণিজ্য ও পর্যটন গেটওয়ে ‘গ্যিরং পোর্ট’ (Gyirong Port) এবং তিমুরে বাজার পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এছাড়া সিয়াব্রুবেসি, বেत्रावती এবং ত্রিসূলী বাজার এলাকার শত শত বাড়িঘর, হোটেল, রাস্তাঘাট ও বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প মাটির নিচে চাপা পড়েছে।
উদ্ধার কার্যক্রম ও মানবিক সংকট: দুর্যোগের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, পাহাড়ি অঞ্চলের অনেক স্বয়ংক্রিয় জলস্তর পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বা আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম চরম পানির স্রোতে ভেসে যাওয়ার কারণে আগাম কোনো সতর্কতা জারি করার সুযোগ পাওয়া যায়নি।
- নিখোঁজ ও হতাহতের বিশাল তালিকা: নেপাল সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের তথ্যমতে, দেশজুড়ে দুই হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে বহু দেশি-বিদেশি পর্যটক, তীর্থযাত্রী ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের শ্রমিক রয়েছেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, নিখোঁজদের মধ্যে তিন শতাধিক ভারতীয় নাগরিকও রয়েছেন, যাদের সন্ধানে উদ্ধারকাজ চলছে।
- অর্থনৈতিক ক্ষতি ও পুনর্গঠন চ্যালেঞ্জ: নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে জানিয়েছেন, এই মহাবিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে দেশের মোট অর্থনীতির প্রায় দশভাগের সমান অর্থাৎ ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। হাসপাতালগুলোতে মরদেহের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এবং স্থান সংকুলান না হওয়ায় এক কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় জরুরি তহবিল ও উদ্ধারকারী দল প্রেরণ করেছে।
উপসংহার ও গ্রিনপেজ দৃষ্টিভঙ্গি: হিমালয় অঞ্চলের উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলশ্রুতিতে বরফ গলা ও হিমবাহ ভাঙার এই ঘটনা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার পাহাড়ি ইকোসিস্টেমের জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত।
গ্রিনপেজ মনে করে, কেবল তাৎক্ষণিক ত্রাণ বিতরণ নয়, বরং হিমালয় অববাহিকা জুড়ে উন্নত ও আধুনিক ক্রসবর্ডার আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম এবং ট্রান্সবাউন্ডারি জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় ও অপরিহার্য দাবি।
