– খন্দকার মুনতাসির হোসেন
২৬শে আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আঘাত হানা ভয়াবহ আকস্মিক বন্যাটি শুধু একটি হিমালয়ী দুর্যোগ নয়। বাংলাদেশ হিমালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর ভাটিতে অবস্থিত, যা তুলে ধরে যে কীভাবে পানি ও জলবায়ু সংক্রান্ত সমস্যা জাতীয় সীমানা অতিক্রম করতে পারে।
প্রাথমিক স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, উচ্চভূমিতে হিমবাহ এবং তার নিচের শিলাস্তরের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়েছে। এর ফলে লেন্ডে খোলা (Lhende Khola River) নদীতে বরফ-পাথরের ধস এবং ধ্বংসাবশেষের স্রোত বয়ে যায়।
এর ফলে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস ভোতে কোশী ও ত্রিশূলী নদী প্রণালীর (Bhote Koshi and Trishuli river systems) মধ্য দিয়ে ভাটির দিকে প্রবাহিত হয়। ফলস্বরূপ, মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে নদীর জলস্তর নয় মিটার পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল বলে জানা গেছে।
জলবায়ুর দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘটনাটিকে যা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে তা হলো এর সাথে জড়িত বিপদের শৃঙ্খল। উষ্ণ জলবায়ুর অর্থ কেবল এই নয় যে হিমবাহ গলে যাবে এবং নদীতে আরও বেশি পানি আসবে।
ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা হিমবাহ, তুষারস্তর, পারমাফ্রস্ট (Parma post) এবং খাড়া পর্বতের ঢালকে ধরে রাখা শিলা-বরফ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। এই উপাদানগুলো যখন কম স্থিতিশীল হয়ে পড়ে, তখন একটি বিপদ আরেকটি বিপদের কারণ হতে পারে।
নেপালের ক্ষেত্রে ঘটনাপ্রবাহটি ছিল:
হিমবাহের ধস → ভূমিধস → নদীর সাময়িক প্রতিবন্ধকতা → আকস্মিক বন্যা → ধ্বংসাবশেষ প্রবাহ।
তবে, জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি এই নির্দিষ্ট বিপর্যয়ের কারণ ছিল—একথা বলে বিজ্ঞানকে অতিসরলীকরণ না করাটা গুরুত্বপূর্ণ। উষ্ণায়ন, হিমবাহের অবস্থা, বরফগলা এবং ভূতাত্ত্বিক কারণগুলোর সুনির্দিষ্ট দায় নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও গবেষণা করছেন, যা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে তা হলো, উষ্ণায়িত হিমালয় উচ্চ-পর্বতীয় বিপদের পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলছে। হিমবাহের অস্থিতিশীলতা, ভূমিধস, ধ্বংসাবশেষ প্রবাহ এবং সংশ্লিষ্ট বন্যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
তাহলে এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভূমিকা কী? বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থা গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র–মেঘনা (জিবিএম) অববাহিকার ভাটির প্রান্তে অবস্থিত। তাই বাংলাদেশের জল ব্যবস্থার একটি বড় অংশ শত শত বা এমনকি হাজার হাজার কিলোমিটার উজানে ঘটে চলা বিভিন্ন প্রক্রিয়ার সাথে সংযুক্ত।
এর মানে এই নয় যে নেপালে হিমবাহ ধসে পড়লে সরাসরি বাংলাদেশে বন্যা হবে। লেণ্ডে–ভোটে কোশী–ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থাটি সরাসরি বাংলাদেশে প্রবাহিত না হয়ে শেষ পর্যন্ত গণ্ডক (Gandak) নদীতে গিয়ে মেশে।
কিন্তু এর থেকে বৃহত্তর শিক্ষাটি হলো অববাহিকা-স্তরের দুর্বলতা সম্পর্কে। হিমালয়কে প্রায়শই দক্ষিণ এশিয়ার জলস্তম্ভ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। বরফ, হিমবাহ, বৃষ্টিপাত, পলি প্রবাহ এবং নদীর প্রবল স্রোতের পরিবর্তন সংযুক্ত এলাকাগুলোতে জলের প্রাপ্যতা, নদীর আকৃতি এবং বন্যার ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে।
জিবিএম অববাহিকার উপর সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো দেখায় যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সব ঋতুতেই নদীর প্রবাহ বেড়েছে এবং বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ নদী বিন্দুগুলোতে ভয়াবহ বন্যার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেয়েছে। সুতরাং, বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু অভিযোজনকে শুধুমাত্র বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে বৃষ্টিপাতের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায় না।
বাংলাদেশকে বন্যা ব্যবস্থাপনা এবং আন্তঃসীমান্ত জলবায়ু-ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উভয়ই মোকাবেলা করতে হয়। আমরা দীর্ঘদিন ধরে বাঁধ, নিষ্কাশন ব্যবস্থা, বন্যা পূর্বাভাস এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করে আসছি।
কিন্তু পরিবর্তনশীল জলবায়ু একটি বৃহত্তর কর্মপন্থা দাবি করে। উজান থেকে ভাটির দিকে তথ্য আদান-প্রদানের পদ্ধতি আমাদের উন্নত করতে হবে। এর অর্থ হলো নদীর প্রবাহ, বৃষ্টিপাত, হিমবাহ ও তুষারপাতের রিয়েল-টাইম হালনাগাদ তথ্য, স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং এবং উচ্চভূমির বিপদ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা।
এছাড়াও, অববাহিকা-ভিত্তিক হাইড্রোলজিক্যাল মডেলিং শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে। শুধু ‘বাংলাদেশে কী পরিমাণ বৃষ্টি হবে?’—এই প্রশ্ন না করে, আমাদের এখন জিজ্ঞাসা করতে হবে: ‘সেই পানি বাংলাদেশে পৌঁছানোর আগে পুরো নদী অববাহিকা জুড়ে কী ঘটছে?’
এর অর্থ হলো ক্রায়োস্ফিয়ার বিজ্ঞান (cryosphere science )কে হাইড্রোলজি, জিওমরফোলজি, দুর্যোগ-ঝুঁকি হ্রাস এবং জলবায়ু অভিযোজনের সাথে সংযুক্ত করা। সাম্প্রতিক দুর্যোগটি প্রচলিত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার একটি সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরেছে। বৃষ্টিপাত-ভিত্তিক বন্যা সতর্কতা প্রস্তুতির জন্য কয়েক ঘণ্টা বা দিনের সময় দিতে পারে।
কিন্তু হঠাৎ হিমবাহ বা শিলা-বরফের ধস কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটি বিধ্বংসী বন্যা সৃষ্টি করতে পারে। এর জন্য এমন এক নতুন ধরনের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা প্রয়োজন যা স্যাটেলাইট ব্যবহার করবে, ভূমিকম্পের জন্য নজর রাখবে, নদী পর্যবেক্ষণ করবে, রিমোট সেন্সিং ব্যবহার করবে, জলপ্রবাহের মডেল তৈরি করবে এবং দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান করবে।
তাহলে, নেপাল থেকে বড় শিক্ষাটা কী? নেপালের দুর্যোগকে কেবল একটি দূরবর্তী পার্বত্য দেশের আরেকটি বিধ্বংসী বন্যা হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি একটি আভাস যে, উষ্ণায়ন এবং ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীল উচ্চ-পার্বত্য পরিবেশ একটি সমগ্র অঞ্চলের জন্য কী অর্থ বহন করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য, সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো ‘আমাদের জলবায়ুগত দুর্বলতা আমাদের সীমান্ত থেকে শুরু হয় না।’ এটি শুরু হয় আরও অনেক উজানে, হিমবাহ, পর্বত, নদী এবং বাস্তুতন্ত্রে, যা শেষ পর্যন্ত আমাদের ব-দ্বীপের সাথে সংযুক্ত। জলবায়ু পরিবর্তন ত্বরান্বিত হওয়ার সাথে সাথে, অভিযোজনকে অবশ্যই ক্রমবর্ধমানভাবে আন্তঃসীমান্ত, অববাহিকা-ভিত্তিক এবং বিজ্ঞান-চালিত হতে হবে।
হিমালয় ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ থেকে দূরে হতে পারে। তবে, জলবিজ্ঞানগতভাবে তা নয়।
(বালায় রুপান্তর, রুপান্তর করেছেন রহমান মাহফুজ)।
তথ্যসূত্র:
- রয়টার্স। (২০২৬, ২৬ আগস্ট)। হিমবাহ ধসের কারণে নেপালে প্রাণঘাতী আকস্মিক বন্যা হতে পারে, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
- অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস। (২০২৬, ২৭ আগস্ট)। নেপালের বন্যা উষ্ণায়নরত হিমালয়ে হিমবাহের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিকে তুলে ধরেছে।
- উদ্দিন, এস., ইয়ামাজাকি, ডি., লিন্টার্ন, এ., রেভেল, এম., ও মোদী, পি. (২০২৫)। জলবায়ু পরিবর্তন এবং ইএনএসও (ENSO) গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র–মেঘনা অববাহিকায় মৌসুমী বন্যার প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে। জার্নাল অফ হাইড্রোলজি, ৬৫৮, ১৩৩২০৭।
