মাত্রাতিরিক্ত কংক্রিটের জঙ্গল, অপরিকল্পিত নগরায়ন, জলাভূমি ভরাট এবং নির্বিচারে গাছপালা নিধনের ফলে রাজধানী ঢাকা শহর এখন একটি তীব্র ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ (Urban Heat Island) বা উষ্ণ দ্বীপ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের বর্ষা মৌসুমেও জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামা এবং আর্দ্রতাজনিত তীব্র গরম নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে চরমভাবে দুর্বিষহ করে তুলেছে।
শহরের এই লাগামহীন তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং অসহনীয় পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় পরিবেশ অধিদপ্তর এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন যৌথভাবে রাজধানীতে ব্যাপকভাবে গাছ লাগানোর একটি দূরদর্শী ও নতুন মেগা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, যা ঢাকাকে পুনরায় বাসযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
মেগা পরিকল্পনার রূপরেখা ও বাস্তবায়নের কৌশল: ঢাকা শহরের কংক্রিটের তীব্রতা কমিয়ে এর হারানো সবুজ প্রকৃতি ফিরিয়ে আনতে এই মেগা পরিকল্পনার আওতায় বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে:
- রাস্তা ও ফাঁকা জায়গায় বৃক্ষরোপণ: এই উদ্যোগের আওতায় শহরের প্রতিটি ফাঁকা জায়গা, সড়কদ্বীপ (Median Strip), ফ্লাইওভারের নিচের অংশ এবং প্রধান সড়কগুলোর উভয় পাশে দেশি প্রজাতির দ্রুতবর্ধনশীল ও ছায়াদানকারী গাছ রোপণ করা হচ্ছে। যেসব গাছ বায়ু থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণে এবং চারপাশের তাপমাত্রা কমাতে বেশি কার্যকর, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
- সরকারি প্রতিষ্ঠানের দেয়াল ও উল্লম্ব সবুজায়ন (Vertical Greening): শুধু মাটিতেই নয়, বরং বিভিন্ন সরকারি ও আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানের সীমানা প্রাচীর এবং বড় বড় ভবনের দেওয়ালে ক্লাইম্বার বা লতানো গাছ লাগিয়ে ‘ভার্টিক্যাল গার্ডেনিং’-এর ধারণা চালু করা হচ্ছে, যা কংক্রিটের তাপ শোষণ ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করবে।
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ: রাজধানীর স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলোনিগুলোর খালি জায়গায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে, যাতে আগামী প্রজন্মের মধ্যে গাছ লাগানোর মানসিকতা তৈরি হয়।
- ছাদবাগানে (Rooftop Gardening) পৌর কর ছাড়: ঢাকার ছাদগুলোকে সবুজ ও ঠান্ডা করার উদ্দেশ্যে নগরবাসীকে উৎসাহিত করতে ছাদবাগান জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই নীতিমালার আওতায় যেসব ভবনে সবুজ ছাদ বা রফটপ গার্ডেন থাকবে, তাদের জন্য পৌর কর বা হোল্ডিং ট্যাক্সের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, যা শহুরে তাপমাত্রা কমাতে দারুণভাবে সাহায্য করবে।
উষ্ণ দ্বীপ অঞ্চলের (Urban Heat Island) সংকট ও এর ভয়াবহতা: ঢাকা শহরের চারপাশ যেভাবে কংক্রিট আর পিচঢালা সড়কে ঢেকে ফেলা হয়েছে, তাতে সূর্যের তাপ শোষিত হয়ে তা আটকে থাকে এবং রাতের বেলাও তাপমাত্রা কমতে চায় না। একেই বৈজ্ঞানিক ভাষায় ‘আরবান হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট’ বলা হয়।
এর ফলে নগরীতে শক্তি বা বিদ্যুতের ব্যবহার মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে যাচ্ছে (এসি ও ফ্যানের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে), বায়ু দূষণের মাত্রা তীব্র হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের বিশেষ করে শিশু ও প্রবীণদের মধ্যে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং বিভিন্ন শ্বাসকষ্টজনিত রোগ মারাত্মক আকারে ছড়িয়ে পড়ছে।
গাছপালা না থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত ভূগর্ভে প্রবেশ করতে না পেরে জলাবদ্ধতা তৈরি করছে, যা গরমের তীব্রতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
উপসংহার ও গ্রিনপেজ দৃষ্টিভঙ্গি: ঢাকার ফুসফুস ফিরিয়ে আনতে এবং এটিকে একটি প্রাণবন্ত শহরে রূপান্তর করতে কংক্রিটের বহুতল ভবনের বিস্তার রোধ করে সবুজায়নের কোনো বিকল্প নেই।
শুধু সরকারি কোনো একক প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকাকে এই উষ্ণতার হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন নগরবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত এই মেগা উদ্যোগ যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা অচিরেই ঢাকাকে একটি শীতল, সবুজ এবং বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করতে পারে।
গ্রিনপেজ বিশ্বাস করে, পরিবেশ সুরক্ষায় এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাগুলোর সফল বাস্তবায়নই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি নিরাপদ ও সুস্থ ঢাকা উপহার দিতে পারে।
