জুলাই ২০২৬-এর দ্বিতীয় সপ্তাহে টানা ভারী বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ি ঢলে দেশের সামগ্রিক বন্যা পরিস্থিতি এক জটিল মোড় নিয়েছে। গত কয়েকদিনের ভয়াবহ পরিস্থিতির পর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে পানি নামতে শুরু করায় জনজীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
তবে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সর্বশেষ ১১ জুলাইয়ের বুলেটিন অনুযায়ী, দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদ-নদীর পানির স্তর নতুন করে বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা দিয়েছে, যা নতুন বন্যার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বর্তমান চিত্র ও উত্তরণের পথে: গত ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম বিভাগের সাতটি জেলায় প্রায় সাড়ে ৫ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছিলেন। তবে শুক্রবার (১০ জুলাই) থেকে পানি ধীরগতিতে নামতে শুরু করায় বান্দরবান, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম শহরের নিম্নাঞ্চলগুলো থেকে মানুষের ঘরে ফেরার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা, বিশেষ করে লামা-চাকরিয়া ও লামা-আলীকদম সড়কপথ সচল হয়েছে। তবুও অনেক এলাকায় এখনো ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট কাদামাটিতে তলিয়ে থাকায় মানবিক বিপর্যয় কাটেনি। উদ্ধার অভিযান ও ত্রাণ কার্যক্রম এখনো পুরোদমে চলমান রয়েছে।
উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নতুন বন্যার শঙ্কা: যদিও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে পরিস্থিতি উন্নতির পথে, কিন্তু দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কুশিয়ারা ও সুরমা নদী অববাহিকায় পানি বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ১১ জুলাইয়ের তথ্যানুযায়ী, ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র সতর্ক করেছে যে, ভারতের চেরাপুঞ্জি ও উজানের অববাহিকায় ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও রংপুর অঞ্চলে নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
পরিসংখ্যানের আয়নায় বন্যা: বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সর্বশেষ ১২৭টি পর্যবেক্ষণ স্টেশনের তথ্যানুযায়ী:
- বিপৎসীমার ওপরে: সাঙ্গু, মাতামুহুরী, কুশিয়ারা, মনু ও খোয়াই—এই পাঁচটি প্রধান নদীর পানি ৯টি পয়েন্টে এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
- পানির প্রবাহ: ৭৯টি পর্যবেক্ষণ স্টেশনে পানি বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে, ৪৩টিতে পানি কমছে এবং ৫টিতে অপরিবর্তিত রয়েছে।
- বৃষ্টিপাতের রেকর্ড: গত ২৪ ঘণ্টায় ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে ১০৯ মিলিমিটার এবং বাংলাদেশের ভেতরে চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ২০৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা: দুর্যোগপূর্ণ এই সময়ে উপকূলীয় ও সমুদ্রবন্দরগুলোতে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বলবৎ রাখা হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন উদ্ধারকারী দল সমন্বিতভাবে কাজ করছে। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে ১ হাজারেরও বেশি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে ১২ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
বন্যা আমাদের জন্য প্রতিবছর এক অনিবার্য বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতির উন্নতি হলেও সামনের ৪৮ ঘণ্টার বৃষ্টির পূর্বাভাস নতুন বিপদের ঘণ্টা বাজাচ্ছে।
আমরা আমাদের পাঠকদের অনুরোধ করব, স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনায় সতর্ক থাকতে এবং নদী তীরবর্তী বা নিচু এলাকায় অবস্থানরতদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি রাখতে। গ্রিনপেজ সবসময় পরিবেশগত সংকটের এই তথ্যগুলো বস্তুনিষ্ঠভাবে আপনাদের সামনে তুলে ধরবে।
