জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি দ্রুতগতিতে দক্ষিণ দিকে প্রসারিত হয়ে কৃষিজমি গ্রাস করছে। এই চরম মরুকরণ রোধ করতে এবং বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষে আফ্রিকান ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় সাহারা মরুকরণ রোধে শুরু হয়েছে এক অনন্য উদ্যোগ। সাহেল অঞ্চলের বিশাল এলাকাজুড়ে গাছ লাগিয়ে এবং টেকসই ভূমির ব্যবহার নিশ্চিত করে একটি বিশাল সবুজ প্রাচীর গড়ে তোলার এই ইতিহাসের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী পরিবেশগত প্রকল্প—’দ্য গ্রেট গ্রিন ওয়াল’ (The Great Green Wall) প্রকল্প এখন বিশ্বের পরিবেশ রক্ষায় অন্যতম আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সেনেগাল থেকে জিবুতি অর্থাৎ আটলান্টিক মহাসাগর থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত প্রায় ৮,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বনভূমি গড়ে তোলার উদ্যোগ (New Life/Solution) এখন দৃশ্যমান সাফল্য দেখাতে শুরু করেছে। এই প্রজেক্টের প্রধান লক্ষ্য হলো সাহারা মরুভূমির বিস্তার রোধ করা, মাটির উর্বরতা পুনরুদ্ধার করা এবং সাহেল অঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবিকা নিশ্চিত করা।
প্রকল্পের অগ্রগতি ও পরিবেশগত প্রভাব: ২০২৬ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আফ্রিকান ইউনিয়ন ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এই প্রকল্পের প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
- মাটির পুনরুজ্জীবন: খরা-সহনশীল দেশীয় প্রজাতির গাছ, যেমন—বাবলা এবং বাওবাব রোপণ করার ফলে মরুভূমির রুক্ষ মাটি পুনরায় উর্বর হচ্ছে। মাটির আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় হারিয়ে যাওয়া অনেক বন্যপ্রাণী ও কীটপতঙ্গ এই অঞ্চলে ফিরতে শুরু করেছে।
- সবুজায়ন: এটি কেবল সারি সারি গাছ লাগানো নয়, বরং এটি একটি সমন্বিত বাস্তুসংস্থান পুনরুদ্ধার কর্মসূচি যেখানে প্রায় ১০ কোটি হেক্টর অনুর্বর ভূমি পুনরায় চাষযোগ্য করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
- কার্বন সিঙ্ক: এই বিশাল বনভূমি ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নেবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে বড় ভূমিকা রাখবে।
- আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন: গাছ লাগানোর পাশাপাশি এই প্রজেক্ট লাখ লাখ স্থানীয় কৃষকের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। তারা এখন বনের গাছ থেকে গাম অ্যারাবিক এবং ফলমূল সংগ্রহ করে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করছেন যা দারিদ্র্য দূরীকরণে ভূমিকা রাখবে।
- জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা: ক্রমবর্ধমান উষ্ণতা এবং খরা থেকে সাহেল অঞ্চলকে রক্ষা করার জন্য এই প্রজেক্ট একটি ঢাল হিসেবে কাজ করছে।
‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’ কেবল একটি বনায়ন প্রকল্প নয়, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে মানবজাতির ঘুরে দাঁড়ানোর এক অবিস্মরণীয় প্রতীক। প্রকৃতিকে একটু সুযোগ দিলে সে যে আবার রুক্ষ মরুভূমিকেও সবুজে ভরিয়ে তুলতে পারে, এটি তারই প্রমাণ।
সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ:
-
সাফল্য: এই প্রজেক্টের ফলে ইথিওপিয়া, সেনেগাল ও নাইজেরিয়াসহ কয়েকটি দেশে কয়েক মিলিয়ন হেক্টর অনুর্বর জমি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে, যার ফলে খাদ্য নিরাপত্তাও বেড়েছে।
-
চ্যালেঞ্জ: রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থায়নের অভাব এবং সাহেল অঞ্চলের প্রচণ্ড শুষ্ক আবহাওয়া এই প্রজেক্টের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: গ্রেট গ্রিন ওয়াল শুধু একটি গাছ লাগানোর প্রকল্প নয়, এটি আফ্রিকার মানুষের টিকে থাকার সংগ্রামের এক নতুন দিগন্ত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সময়মতো প্রয়োজনীয় অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে, ২০৩০ সালের মধ্যে এটি বিশ্বের বৃহত্তম জীবিত কাঠামোর মর্যাদা পাবে এবং সাহেল অঞ্চলের চেহারা সম্পূর্ণ বদলে দেবে।
