বাংলাদেশের নদীমাতৃক ইকোসিস্টেম আজ এক ভয়ংকর ‘পরিবেশগত অপরাধ’ বা ইকোলজিক্যাল ক্রাইমের শিকার। মেঘনা, সোমেশ্বরী এবং ধলেশ্বরীর মতো নদীগুলোতে শক্তিশালী ‘বালু মাফিয়া’ চক্রের অপরিকল্পিত ও অবৈধ ড্রেজিংয়ের কারণে নদীর তলদেশ আক্ষরিক অর্থেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) এবং নদী গবেষকদের একটি যৌথ সমীক্ষায় উঠে এসেছে কীভাবে এই অবৈধ বালু উত্তোলন কেবল নদীভাঙনই বাড়াচ্ছে না, বরং জলজ জীববৈচিত্র্যকে চিরতরে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
ইকোলজিক্যাল ক্রাইমের ভয়াবহতা ও মৎস্যসম্পদের ক্ষতি: নদীর তলদেশের বালু হলো মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও ডিম পাড়ার প্রধান আশ্রয়স্থল।
- আবাসস্থল ধ্বংস: শক্তিশালী ড্রেজার দিয়ে যখন নদীর তলদেশ থেকে ২০-৩০ ফুট গভীর গর্ত করে বালু তোলা হয়, তখন কার্প জাতীয় মাছ ও দেশীয় ছোট মাছের প্রজনন ক্ষেত্রগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।
- পানির ঘোলাটে ভাব (Turbidity): ড্রেজিংয়ের ফলে নদীর পানি তীব্র মাত্রায় ঘোলা হয়ে যায়, যা জলজ উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গিয়ে মাছের মড়ক দেখা দিচ্ছে।
- নদীভাঙন ও বাস্তুচ্যুতি: অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণে বর্ষা মৌসুমে নদীর পাড়ে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিচ্ছে, যা হাজার হাজার মানুষকে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত করছে।
প্রতিরোধে নতুন প্রযুক্তি ও আইনি উদ্যোগ: এই অপরাধ দমনে ২০২৬ সালে এসে নৌ-পুলিশ এবং পরিবেশ অধিদপ্তর ‘স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং’ এবং ‘নাইট-ভিশন ড্রোন’ ব্যবহার শুরু করেছে। রাতের অন্ধকারে ড্রেজার চালালে এখন ড্রোনের মাধ্যমে তা শনাক্ত করে তাৎক্ষণিক অভিযান চালানো হচ্ছে।
নদীর বালু কেবল নির্মাণ সামগ্রী নয়, এটি নদীর প্রাণ। এই ইকোলজিক্যাল ক্রাইম শক্ত হাতে দমন করতে না পারলে বাংলাদেশের মিঠা পানির মৎস্যসম্পদ এবং টেকসই অ্যাকোয়াকালচার মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
