জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যে অভিন্ন সংকটের মুখোমুখি, তা মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা ও অর্থায়নকে আরও বাস্তবভিত্তিক করার দাবি জোরালো হয়েছে। ১৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক আঞ্চলিক কূটনৈতিক সংলাপে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের প্রতিনিধিরা জলবায়ু অভিযোজন, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এবং স্থানীয় পর্যায়ের প্রকৃতি-নির্ভর সমাধানের জন্য যৌথ অর্থায়ন কাঠামো গঠনের পক্ষে মত দেন। আলোচনায় বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো শুধু জলবায়ু ঝুঁকির শিকার নয়, বরং তারা এখন পরীক্ষিত কমিউনিটি-ভিত্তিক সমাধানের উৎসও।
সংলাপের আয়োজকরা জানান, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু তহবিলের বড় অংশ এখনো প্রশাসনিক জটিলতা, কঠোর আবেদনপ্রক্রিয়া এবং প্রকল্প-প্রবেশের সীমাবদ্ধতার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর কাছে পৌঁছায় না। তাই অর্থায়নের ভাষা, কাঠামো এবং অনুমোদন প্রক্রিয়াকে অভিযোজন-সহজ ও দেশভিত্তিক করা জরুরি।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা বলেন, উপকূলীয় সুরক্ষা, পাহাড়ি ভূমিধস, নদীভাঙন এবং নগর বন্যা—সব ক্ষেত্রেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর চাহিদা ও অভিজ্ঞতা প্রায় একই রকম।
আঞ্চলিক সংলাপের মূল প্রস্তাবনা ও কূটনৈতিক অগ্রাধিকার: সংলাপে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রস্তাব উঠে আসে, যা আগামী বছরগুলোর জলবায়ু কূটনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
- আঞ্চলিক জলবায়ু অভিযোজন তহবিল:
দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি আলাদা দ্রুত-সহজ তহবিল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়, যেখানে ক্ষুদ্র প্রকল্প, স্থানীয় পরীক্ষামূলক উদ্যোগ এবং কমিউনিটি-নেতৃত্বাধীন অভিযোজন সরাসরি অর্থায়ন পাবে। - স্থানীয় সমাধানকে নীতিতে অন্তর্ভুক্তকরণ:
হাওর ব্যবস্থাপনা, উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার, পাহাড়ে ভূধস নিয়ন্ত্রণ, শুষ্ক অঞ্চলে জলধারণ প্রযুক্তি এবং নগরাঞ্চলে সবুজ নিষ্কাশনব্যবস্থা—এসব স্থানীয় অভিজ্ঞতাকে বৈশ্বিক নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়। - দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা জোরদার:
প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, জলবায়ু তথ্যভান্ডার, স্যাটেলাইট মনিটরিং এবং দুর্যোগ পূর্বাভাসে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে বিদেশি পরামর্শের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমবে। - জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি পুনর্ব্যক্ত:
আলোচনায় উঠে আসে যে, যেসব দেশ ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করেছে, তাদেরই অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতির জন্য বেশি আর্থিক দায় নিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে শুধু ‘প্রকল্প গ্রহীতা’ নয়, বরং নীতিনির্ধারণী অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে।
বাংলাদেশের অবস্থান ও কৌশলগত বার্তা: বাংলাদেশি প্রতিনিধিরা বৈঠকে বলেন, দেশের উপকূল, হাওর ও নগর পরিবেশে ইতোমধ্যে বহু স্থানীয় অভিযোজন মডেল সফল হয়েছে। এগুলোকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তায় বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতে পারলে দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বজুড়ে একটি অভিযোজন-উদ্ভাবনী অঞ্চল হিসেবে দাঁড়াতে পারে।
বিশেষ করে বন্যা-সহনশীল আবাসন, কম খরচের জলাধার, কমিউনিটি সতর্কতা ব্যবস্থা এবং কৃষিভিত্তিক অভিযোজন মডেলে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু কার্বন নির্গমন কমানোর লক্ষ্য নিয়ে জলবায়ু সংকটের পূর্ণ সমাধান হবে না; বরং ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের মানুষের বাস্তব প্রয়োজন, স্থানচ্যুতি, জীবিকা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় অভিযোজন অর্থায়নকে আরও মানবকেন্দ্রিক করতে হবে। এ কারণেই ঢাকার এই সংলাপকে আঞ্চলিক জলবায়ু কূটনীতির একটি তাৎপর্যপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উপসংহার ও গ্রিনপেজ দৃষ্টিভঙ্গি: গ্রিনপেজ মনে করে, দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এখন প্রতীকী ঘোষণা নয়, দরকার বাস্তব, সহজপ্রাপ্য এবং স্থানীয়ভাবে কার্যকর অর্থায়ন কাঠামো।
ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই সংলাপ যদি কেবল আলোচনা না হয়ে নীতিগত পদক্ষেপে রূপ নেয়, তবে তা বাংলাদেশের পাশাপাশি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এক নতুন অভিযোজন মডেল তৈরি করবে। জলবায়ু ন্যায়বিচার তখনই অর্থবহ হবে, যখন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হাতে দ্রুত, সহজ এবং কার্যকর সমাধান পৌঁছাবে।
