দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সমৃদ্ধ কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ প্রাকৃতিক অঞ্চল পূর্ব হিমালয়কে রক্ষায় একটি বৃহৎ আঞ্চলিক সংরক্ষণ উদ্যোগের ঘোষণা এসেছে, যার লক্ষ্য ১০০ কোটি মার্কিন ডলার সংগ্রহ করা। ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, হিমালয়ের হিমবাহ থেকে শুরু করে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদী হয়ে বঙ্গোপসাগরের মোহনা এবং সুন্দরবনের বিস্তৃত ম্যানগ্রোভ অঞ্চল—এই পুরো আন্তঃসংযুক্ত বাস্তুতন্ত্র একসঙ্গে রক্ষা করার জন্য “দ্য গ্রেট পিপলস ফরেস্ট” নামের কর্মসূচি সামনে আনা হয়েছে। উদ্যোগটির মূল লক্ষ্য শুধু বন সংরক্ষণ নয়; বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনজীবিকা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তিতে দাঁড় করানো।
কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনাল, বালিপাড়া ফাউন্ডেশন এবং স্থানীয় অংশীদাররা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সময় এই কর্মসূচি উপস্থাপন করে জানায়, পূর্ব হিমালয় অঞ্চল বিশ্বে এমন এক গুরুত্বপূর্ণ ভূদৃশ্য, যা কোটি মানুষের খাদ্য, পানি, কার্বন সঞ্চয় এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরাসরি ভূমিকা রাখে। কিন্তু একই সঙ্গে অঞ্চলটি দ্রুত উষ্ণায়ন, বন উজাড়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জীবিকার সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি হয়ে উঠছে।
উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ও কৌশলগত পরিধি: প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই কর্মসূচির মাধ্যমে দশকের শেষ নাগাদ কয়েকটি বড় উদ্দেশ্য পূরণে কাজ করা হবে।
- ১০০ কোটি ডলার সংগ্রহ ও স্থানীয় উদ্যোগ সম্প্রসারণ:
উদ্যোগটির লক্ষ্য হলো ১০০ কোটি ডলার সংগ্রহ করে স্থানীয় পর্যায়ে চলমান পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত করা। এই তহবিলের মাধ্যমে ১০০ কোটি গাছ লাগানো, ১০ লাখ হেক্টর বন ও প্রাকৃতিক ভূমি সংরক্ষণ এবং পুনরুদ্ধার করা হবে। কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনালের ভাষ্য অনুযায়ী, এখানে নতুন কিছু শুরু করার চেয়ে আগে থেকেই কাজ করে যাওয়া স্থানীয় সংগঠনগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোই মূল উদ্দেশ্য। - জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও আন্তঃসংযুক্ত বাস্তুতন্ত্র রক্ষা:
পূর্ব হিমালয়ের পাহাড়, নদী, বন, জলাভূমি, উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ ও বদ্বীপ অঞ্চলকে একটি অবিচ্ছিন্ন বাস্তুতন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। হিমবাহ গলে নদীতে পানি যোগায়, নদী কৃষি ও জীবিকাকে সহায়তা করে, আর মোহনা ও সুন্দরবন ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। এই আন্তঃসম্পর্কিত ব্যবস্থাকে রক্ষার মধ্য দিয়েই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি টেকসইতা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। - স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে সংরক্ষণ:
উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে স্থানীয় মানুষ। বন, পাহাড় ও উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দারা বহু বছর ধরে নিজেদের অভিজ্ঞতা দিয়ে প্রকৃতি রক্ষা করে আসছেন। কমিউনিটি-ভিত্তিক কৃষি, পুনর্জীবনশীল বনায়ন, প্রাকৃতিক ঢাল রক্ষায় ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার, এবং বন্যপ্রাণী-সহনশীল কৃষি পদ্ধতি—এসব স্থানীয় অভিজ্ঞতাকে জাতীয় ও আঞ্চলিক স্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। - জলবায়ু সহনশীল জীবিকা ও কৃষি:
এই অঞ্চলের অর্থনীতি প্রকৃতিনির্ভর হওয়ায় বন ও নদী রক্ষার সঙ্গে জীবিকার প্রশ্নও সরাসরি জড়িত। তাই কেবল সংরক্ষণ নয়, বিকল্প জীবিকা, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, পুনর্জন্মশীল কৃষিবন (regenerative agroforestry) এবং বাজারমুখী পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে কৃষক ও বননির্ভর জনগোষ্ঠীকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে সুরক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
পূর্ব হিমালয়ের পরিবেশগত গুরুত্ব: প্রতিবেদনটি বলছে, পূর্ব হিমালয় অঞ্চল থেকে উৎপন্ন নদীগুলো গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার মাধ্যমে বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকাকে ধরে রেখেছে। এই অঞ্চল বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ১০০ কোটির জন্য পানি, খাদ্য, মিঠা পানি, কার্বন শোষণ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সেবা দেয়। একই সঙ্গে এটি বিশ্বের মোট জীববৈচিত্র্যের প্রায় ১২ শতাংশের আবাসস্থল হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু গত দুই দশকে এই অঞ্চলে বনভূমি হ্রাসের হার বেড়েছে, আর চরম আবহাওয়ার কারণে লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পূর্ব হিমালয় কেবল পাহাড়ি বনাঞ্চল নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, নদীপ্রবাহ, উপকূলীয় পলি সঞ্চয়, ম্যানগ্রোভের টিকে থাকা এবং কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই এই অঞ্চল সংরক্ষণ মানে শুধু গাছ বাঁচানো নয়, বরং পুরো অঞ্চলজুড়ে পরিবেশগত স্থিতি বজায় রাখা।
বাংলাদেশের প্রাসঙ্গিকতা: বাংলাদেশের জন্য এই উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা নদী হয়ে জলপ্রবাহ, পলি সরবরাহ, বন্যা-ঝুঁকি, লবণাক্ততা এবং সুন্দরবনের স্বাভাবিক পুনর্জীবন—সবকিছুই পূর্ব হিমালয়ের বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। সুন্দরবনে ঝড়ের ক্ষতি কমাতে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারের প্রয়োজন যেমন রয়েছে, তেমনি উপকূলীয় অঞ্চলে নদীপ্রবাহ ও লবণাক্ততার ভারসাম্য বজায় রাখাও জরুরি। প্রতিবেদনে সুন্দরবনে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারের উদাহরণও উল্লেখ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের পরিবেশ বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি মিলে যায়।
বাংলাদেশি পরিবেশবিদদের মতে, এ ধরনের আঞ্চলিক সংরক্ষণ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশটি জলবায়ু সহনশীলতা, প্রকৃতিনির্ভর সমাধান এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে নতুন সহযোগিতার সুযোগ পেতে পারে। বিশেষ করে সীমান্ত-অতিক্রমকারী নদী ও বন ব্যবস্থাপনায় আঞ্চলিক সমন্বয় বাংলাদেশের পরিবেশ নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞ ও অংশীদারদের বক্তব্যের তাৎপর্য: কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনালের নেতৃত্বের বক্তব্যে উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা—এই অঞ্চল পৃথিবীর অন্যান্য বড় সংরক্ষিত বাস্তুতন্ত্রের তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম আন্তর্জাতিক মনোযোগ ও অর্থায়ন পায়। অথচ ঝুঁকি এবং প্রয়োজন, দুই-ই অনেক বেশি। তাই স্থানীয় সংগঠনগুলোকে একত্র করা, তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা নয় বরং সহযোগিতা তৈরি করা, এবং বিদ্যমান সফল সমাধানগুলোকে বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়াই এ উদ্যোগের মূল দর্শন।
এই দৃষ্টিভঙ্গি দক্ষিণ এশিয়ার সংরক্ষণ রাজনীতিতে একটি বড় বার্তা দেয়: সংরক্ষণকে বাইরে থেকে চাপানো মডেল হিসেবে না দেখে স্থানীয় জনগণের জ্ঞান, চর্চা ও নেতৃত্বের ওপর ভিত্তি করে এগোতে হবে। এতে বন, নদী, জমি ও মানুষের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।
উপসংহার ও গ্রিনপেজ দৃষ্টিভঙ্গি: গ্রিনপেজ মনে করে, পূর্ব হিমালয় ও সুন্দরবনকে যুক্ত করে এই আঞ্চলিক সংরক্ষণ প্রচেষ্টা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত পরিবেশগত পদক্ষেপ। বিশ্বজুড়ে জীববৈচিত্র্য ক্ষয় ও জলবায়ু সংকটের সময়ে স্থানীয় মানুষকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এমন উদ্যোগ ভবিষ্যতের টেকসই উন্নয়নের পথ দেখাতে পারে। যদি এই ১০০ কোটি ডলারের লক্ষ্য সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা শুধু পাহাড়, বন ও নদী রক্ষাই করবে না, বরং কোটি মানুষের জীবিকা ও নিরাপত্তাকেও নতুন ভিত্তি দেবে।
