শিরোনাম: খাঁচাবন্দি জীবনের অবসান: কাঁটাবন ও টঙ্গীর অবৈধ পাখির বাজারে বন বিভাগের সাঁড়াশি অভিযান
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র কাঁটাবন এবং শিল্পশহর টঙ্গীর বিভিন্ন পোষা প্রাণীর বাজারে দীর্ঘদিন ধরে আড়ালে-আবডালে দেদারসে বিক্রি হচ্ছিল শত শত প্রজাতির বন্য পাখি এবং বিপন্ন বন্যপ্রাণী। উন্মুক্ত বাজারে খাঁচায় বন্দি এসব দেশীয় ও পরিযায়ী পাখি দেখলে বোঝার উপায় থাকে না যে, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী এদের ধরা বা কেনাবেচা সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ।
বন্যপ্রাণী পাচার ও অবৈধ বাণিজ্য রোধে বনের আইন কঠোর করতে নতুন সরকারের বন বিভাগ অবশেষে এই অবৈধ বাজারগুলোতে এক সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করেছে, যা পরিবেশবাদীদের দীর্ঘদিনের দাবির এক বাস্তব প্রতিফলন।
উদ্ধার অভিযান এবং পাখির নিরাপদ অবমুক্তকরণ: পরিবেশ ও বন বিভাগের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট এবং বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের যৌথ উদ্যোগে এই ঝটিকা অভিযান পরিচালিত হয়। বাজারের দোকানগুলোতে তল্লাশি চালিয়ে খাঁচায় গাদাগাদি করে রাখা হাজার হাজার পাখি উদ্ধার করা হয়।
- উদ্ধারকৃত পাখির বৈচিত্র্য: উদ্ধার হওয়া পাখির মধ্যে ছিল তিলা মুনিয়া, বালিহাঁস, বিভিন্ন প্রজাতির টিয়া, শালিক, ঘুঘু এবং স্থানীয় নানা রঙের পরিযায়ী পাখি।
- প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়া: উদ্ধার করার পর পাখিগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে খাঁচাবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করে দেওয়া হয়। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে সুস্থ পাখিগুলোকে ঢাকার মিরপুর জাতীয় বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং গাজীপুরের ঐতিহাসিক ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করা হয়েছে।
আইনি ব্যবস্থা ও জিরো টলারেন্স নীতি: বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বর্তমান সরকার যে আপসহীন মনোভাব নিয়েছে, এই অভিযানে তার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। অবৈধ পাখি ও বন্যপ্রাণী বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে:
- বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন প্রয়োগ: ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২’ অনুযায়ী নিষিদ্ধ প্রাণী বিক্রির অপরাধে বেশ কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ীকে হাতেনাতে আটক করা হয়।
- জরিমানা ও কারাদণ্ড: ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অপরাধীদের নগদ অর্থদণ্ড এবং সুনির্দিষ্ট মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ভবিষ্যতে এ ধরনের অবৈধ ব্যবসার পুনরাবৃত্তি করলে সংশ্লিষ্ট দোকানের লাইসেন্স চিরতরে বাতিল করার কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
জীববৈচিত্র্য ও ইকোসিস্টেমের ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব: পাখি প্রকৃতির ফুসফুস ও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বনের বীজ ছড়ানো, পরাগায়ন নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিকর পোকামাকড় দমন করে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে পাখিদের ভূমিকা অপরিসীম। বনের ভেতর থেকে অবৈধভাবে পাখি শিকার করে বাজারে বিক্রি করার ফলে আমাদের বনাঞ্চলগুলো ধীরে ধীরে পাখিহীন হয়ে পড়ছে, যা প্রাকৃতিক খাদ্য শৃঙ্খলে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রাজধানীর অবৈধ বাজারগুলোতে এই আঘাত হানার ফলে চোরাকারবারীদের মনে বড় ধরনের ভয় তৈরি হবে।
গ্রিনপেজ দৃষ্টিভঙ্গি: বন্যপ্রাণী ও পাখি কেনাবেচার মতো অপরাধের বিরুদ্ধে সরকারের এই কঠোর অবস্থান সমগ্র দেশের জীববৈচিত্র্য এবং সামগ্রিক ইকোসিস্টেম রক্ষায় একটি অত্যন্ত জোরালো বার্তা দিচ্ছে। শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযান নয়, বরং আমাদের নিজেদের সচেতন হতে হবে—’পাখি খাঁচায় বন্দি রাখার জন্য নয়, প্রকৃতির মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ানোর জন্য।’
গ্রিনপেজ বিশ্বাস করে, প্রশাসনের এমন নিয়মিত অভিযান এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই আমাদের প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী চিরতরে সুরক্ষিত থাকবে।
