28 C
ঢাকা, বাংলাদেশ
[bam92Saturdayam_304209Asia/Dhaka] | [Asia/Dhaka92Saturday423702_26am30Asia/Dhaka] খ্রিস্টাব্দ | [bam92Saturdayam_26am30Asia/Dhaka] বঙ্গাব্দ
গ্রীন পেইজ
মানবতার নিঃশব্দ পদচারণা: বাংলাদেশে ইতালীয়দের অবদান ও ঐতিহাসিক স্বীকৃতি
নিকোলাস বিশ্বাস বাংলাদেশ পরিবেশ শিক্ষা স্বাস্থ্য কথা

মানবতার নিঃশব্দ পদচারণা: বাংলাদেশে ইতালীয়দের অবদান ও ঐতিহাসিক স্বীকৃতি

– নিকোলাস বিশ্বাস 

সীমানা, ভৌগোলিক দূরত্ব ও ধর্মীয় পরিচয়ের সংকীর্ণ গণ্ডি অতিক্রম করে নিঃস্বার্থ মানবসেবায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার ইতিহাস এ পৃথিবীতে বিরল নয়, তবে স্বাধীন বাংলাদেশে ইতালীয় মিশনারিদের দীর্ঘ কয়েক দশকের নীরব ত্যাগ ও আত্মনিবেদন সেই ইতিহাসকে এক অনন্য ও মহিমান্বিত উচ্চতায় উন্নীত করেছে।

দক্ষিণবঙ্গের ঝোড়ো উপকূলীয় অঞ্চলের কুষ্ঠ ও যক্ষ্মারোগী থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গের সমতলের সাঁওতাল সম্প্রদায় কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি উপত্যকার সুবিধাবঞ্চিত শিশু -এদেশের অবহেলিত, চরম শোষিত ও প্রান্তিক মানুষের পাশে এই ইতালীয় ধর্মযাজক ও সন্ন্যাসিনীরা দাঁড়িয়েছেন পরম মমতায় ও পরম অভিভাবকত্বে।

সম্প্রতি ইতালীয় প্রজাতন্ত্রের মহামান্য প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাত্তারেলা কর্তৃক দুই নিবেদিতপ্রাণ ইতালীয় মিশনারি – সিস্টার রবার্টা পিনিওনে (Sister Roberta Pignone) এবং ফাদার পিয়েত্রো লুইজি লুপি (Father Pietro Luigi Lupi) -কে ইতালির অন্যতম সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় নাইট সম্মাননা ‘Cavaliere dell’Ordine della Stella d’Italia’ (অর্ডার অব দ্য স্টার অব ইতালি) -তে ভূষিত করা কেবল তাঁদের ব্যক্তিসত্তার অনন্য মূল্যায়ন নয়; বরং এটি বাংলাদেশে তাঁদের যুগের পর যুগ ধরে চলা পালকীয়, চিকিৎসাসেবা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রতি এক ঐতিহাসিক স্বীকৃতি।

এ স্বীকৃতি ক্যাথলিক মণ্ডলীর সেবাকে নতুন মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে এবং বাংলাদেশে বসবাসরত সমগ্র ইতালীয় সম্প্রদায়ের জন্য বয়ে এনেছে এক অনন্য গৌরব। এটি ইতালির একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বেসামরিক সম্মাননা। বিদেশে ইতালির ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা এবং অন্য দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখা ব্যক্তিদের এই ‘নাইট’ উপাধি দেওয়া হয়।

স্বাস্থ্যখাতে, বিশেষ করে দক্ষিণ বাংলাদেশের অবহেলিত চিকিৎসা ব্যবস্থায় সিস্টার রবার্টা পিনিওনের অবদান এক মহাকাব্যিক ও অবিশ্বাস্য দৃষ্টান্ত। ‘মিশনারি সিস্টার্স অব দি ইমাকুলেট’ (বাংলাদেশে এরা পিমে সিস্টার্স – PIME Sisters নামে পরিচিত) ক্যাথলিক সন্ন্যাসিনী সংঘের এই উৎসর্গীকৃতপ্রাণ পেশায় একজন দক্ষ চিকিৎসক। তিনি মূলত দক্ষিণবঙ্গের উপকূলীয়, দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবায় নিজেকে পুরোপুরি বিলিয়ে দিয়েছেন।

খুলনা ধর্মপ্রদেশের অন্তর্গত ঐতিহাসিক ড্যামিয়েন হাসপাতালের (Damien Hospital) প্রকল্প পরিচালক এবং একমাত্র সার্বক্ষণিক চিকিৎসক হিসেবে সিস্টার রবার্টা পিনিওন দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে কুষ্ঠ (Leprosy), যক্ষ্মা (TB) এবং এইচআইভি/এইডস (AIDS) আক্রান্ত চরম সামাজিক অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার রোগীদের জন্য এই ড্যামিয়েন হাসপাতালটিই হলো একমাত্র বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র।

সিস্টার রবার্টা এখানে ৩৩ শয্যার মূল হাসপাতালটি দক্ষতার সাথে পরিচালনার পাশাপাশি আরো ৩টি গ্রামীণ ক্লিনিক এবং ১৫টি যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র তদারকি করেন। শুধু হাসপাতালের চার দেয়ালের মধ্যে নিজের সেবাকে সীমাবদ্ধ না রেখে, তিনি খুলনার ভয়াবহ ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকাগুলোতে এবং অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারগুলোর দরজায় দরজায় ঘুরে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি ও বিনামূল্যে মানসম্মত ওষুধ বিতরণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

সমাজে কুষ্ঠ ও যক্ষ্মা আক্রান্ত রোগীরা যেন সামাজিক কুসংস্কার, ছোঁয়াচে ভয় ও বৈষম্যের শিকার হয়ে পরিবারচ্যুত না হন, সেই লক্ষ্যে তাঁর নিরলস মানসিক ও সামাজিক সংগ্রাম চিকিৎসা খাতকে অতিক্রম করে এক মানবিক ও রূপান্তরকামী আন্দোলনে উন্নীত হয়েছে।

অন্যদিকে, শিক্ষা বিস্তার, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সুরক্ষা এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় ফাদার পিয়েত্রো লুইজি লুপি (যাঁকে এদেশের মানুষ ভালোবেসে ফাদার লুপি নামে ডাকেন) এক নীরব অথচ গভীর সামাজিক বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন। ইতালীয় ক্যাথলিক সংঘ ‘জ্যভেরিয়ান ফাদার্স’ (Xaverian Fathers) -এর সম্মানিত পুরোহিত এবং বাংলাদেশে এই সংঘের সাবেক আঞ্চলিক সুপিরিয়র (Regional Superior) হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দিয়েছেন।

এদেশের দরিদ্র, অসহায় ও জাতিগত সংখ্যালঘু মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তাঁদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়। বিশেষ করে সাতক্ষীরা ও খুলনা অঞ্চলের চরম অবহেলিত ও প্রান্তিক ‘দলিত’ (Dalit) সম্প্রদায়ের আর্থ-সামাজিক রূপান্তরে ফাদার লুপির দূরদর্শী ভূমিকা অসাধারণ। তাঁর নিরবচ্ছিন্ন উৎসাহ, দিকনির্দেশনা ও প্রত্যক্ষ সহায়তায় স্থানীয় দলিত যুবকরা উচ্চশিক্ষা অর্জনের সুযোগ পেয়েছেন এবং নিজেদের আইনি ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘দলিত’ নামক শক্তিশালী এনজিও গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।

কেবল গ্রামীণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীই নয়, ঢাকার তেজগাঁও রেলস্টেশন সংলগ্ন নোংরা ও বিপজ্জনক বস্তি এলাকার ছিন্নমূল শিশুরা যেন কঠোর শিশুশ্রম ও অপরাধের অন্ধকার জগতে না হারিয়ে শিক্ষার আলো পায়, তার জন্য তিনি সমন্বিত স্কুল ও ডে-কেয়ার সেন্টার পরিচালনা করেছেন। পাশাপাশি বান্দরবানের লামার মতো দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের শিক্ষাদানে তিনি নিজেকে যুক্ত রেখেছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া অমানবিক পরিস্থিতির শিকার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের খাদ্য, স্বাস্থ্য ও মানবিক সহায়তা সুনিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাঁদের আর্তপীড়িত কণ্ঠস্বর তুলে ধরতেও ফাদার লুপি নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্যেও তিনি আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।

বাংলাদেশে ইতালীয় মিশনারিদের এই নিঃস্বার্থ সেবা এবং প্রেমের ইতিহাস কেবল সাম্প্রতিক দশকগুলোর ঘটনাবলী নয়; এর রক্তের ও আত্মার শক্ত শেকড় প্রোথিত রয়েছে আমাদের ১৯৭১ সালের গৌরবময় মহান মুক্তিযুদ্ধে। পাকিস্তানি বাহিনীর পাশবিক বর্বরতা ও গণহত্যার মুখে জ্যভেরিয়ান (Xaverian) এবং পিমে (PIME) Missions -এর ইতালীয় পুরোহিতগণ নিজেদের গির্জা, মিশন ও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে চরম প্রাণভয় উপেক্ষা করে এলাকার ভীত-সন্ত্র্যস্থ আপামর জনসাধারণের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থানে পরিণত করেছিলেন।

তাঁরা স্বাধীনতাকামী মানুষের পাশে পরম বন্ধুর মতো দাঁড়িয়েছিলেন। বিশেষভাবে ফাদার মারিনো রিগন আমাদের বানিয়ারচর ধর্মপল্লীতে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন আশ্রয়ে রেখে চিকিৎসা দিয়েছেন ও নিরাপত্তা নিশ্চিৎ করেছেন। এই বীরত্বপূর্ণ মানবিক অবদান ও অকৃত্রিম বন্ধুত্বের ঐতিহাসিক স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার জ্যভেরিয়ান মিশনারি ফাদার মারিনো রিগনকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ (Friends of Liberation War Honour) প্রদান করে।

ফাদার মারিনো রিগন ছিলেন এদেশের ইতালীয় মিশনারিদের মধ্যে এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। দীর্ঘ ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করে তিনি শিক্ষা বিস্তার ও মানবসেবার পাশাপাশি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ভালোবেসেছিলেন আপন হৃদয়ে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কবি জসীমউদ্দীনের বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম ইতালি ভাষায় অনুবাদ করে তিনি বিশ্ব দরবারে বাঙলা সাহিত্যকে নতুন করে তুলে ধরেছিলেন। এ অসামান্য অবদানের জন্য ২০০৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে অনন্য সম্মানসূচক নাগরিকত্ব (Honorary Citizenship) প্রদান করে।

২০১৭ সালে তিনি ইতালিতে মৃত্যুবরণ করলেও, তাঁর শেষ ইচ্ছা ছিল এই প্রিয় বাংলার মাটিতেই শায়িত হওয়ার। সেই আকুল ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ ও ঐতিহাসিক উদ্যোগে তাঁর মরদেহ ইতালির রোম থেকে মোংলার শেলাবুনিয়া গ্রামে নিয়ে আসা হয়। সেখানে বাংলাদেশ পুলিশের একটি চৌকস দল তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করে এবং সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।

এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলের সাঁওতাল ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, ভূমি অধিকার ও শিক্ষার প্রসারে ফাদার পাওলো চিচেরি সহ বহু ইতালীয় পিমে (PIME) মিশনারির ঐতিহাসিক ভূমিকা স্থানীয় প্রশাসন ও জাতীয় পর্যায়ে সবসময় ভূয়সী প্রশংসা লাভ করেছে।

এই মহান ত্যাগের বার্তা শুধু সেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি মূলত ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবিক মেলবন্ধনের এক পরম শিক্ষা। বাংলাদেশের প্রথম কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি’রোজারিও সিএসসি যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে, বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক অনাস্থা ও ভুল ধারণা দূর করতে খ্রিস্টানদের সম্প্রীতির সেতু হিসেবে কাজ করা অপরিহার্য। আন্তধর্মীয় সংলাপ ও প্রত্যক্ষ ভালোবাসার মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই মানবিক সম্পর্কই সমাজকে সুন্দর ও শান্তিময় করে তুলতে পারে।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যখন বৈশ্বিক মেরুকরণ, অর্থনৈতিক স্বার্থপরতা ও বর্ণবাদী অসহিষ্ণুতা বিস্তার লাভ করছে, ঠিক সেই সময়ে দাঁড়িয়ে এই ইতালীয় মিশনারিদের আত্মত্যাগী জীবন আমাদের নতুন করে শেখায় যে – প্রকৃত মানবধর্ম কোনো ভৌগোলিক সীমানা, জাতীয়তা বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না।

সিস্টার রবার্টা ও ফাদার লুপির মতো দূরদর্শী সাধকেরা এদেশের স্বাস্থ্য ও সামাজিক রূপান্তর সূচকে যে নীরব অবদান রেখে চলছেন, তা বাংলাদেশ ও ইতালির মধ্যে দ্বিপাক্ষিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের মূল শক্তিস্বরূপ। এ সম্পর্ক কেবল ব্যবসা-বাণিজ্য বা রাজনীতির ওপর ভিত্তি করে গঠিত নয়, বরং এটি গঠিত হয়েছে রক্তের, মমতার ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক ইস্পাতকঠিন ভিতের ওপর।

বাংলাদেশের এই নিভৃত আলো ছড়ানো বিদেশি বন্ধুদের প্রতি রাষ্ট্র, সমাজ ও এদেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

নিকোলাস বিশ্বাস
একজন মিডিয়া ফ্রিল্যান্সার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত লেখক। 

“Green Page” কে সহযোগিতার আহ্বান

সম্পর্কিত পোস্ট

Green Page | Only One Environment News Portal in Bangladesh
Bangladeshi News, International News, Environmental News, Bangla News, Latest News, Special News, Sports News, All Bangladesh Local News and Every Situation of the world are available in this Bangla News Website.

এই ওয়েবসাইটটি আপনার অভিজ্ঞতা উন্নত করতে কুকি ব্যবহার করে। আমরা ধরে নিচ্ছি যে আপনি এটির সাথে ঠিক আছেন, তবে আপনি ইচ্ছা করলেই স্কিপ করতে পারেন। গ্রহন বিস্তারিত