নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে প্রচলিত ইস্পাত, লোহা ও প্লাস্টিকের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব উপকরণের ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জন করেছে চীন।
দেশটির শানডং প্রদেশের ইয়ানতাই উপকূলে অবস্থিত অফশোর সোলার প্রদর্শনী ঘাঁটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে বিশ্বের প্রথম ১০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার সম্পূর্ণ বাঁশের কাঠামোয় নির্মিত ভাসমান সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র বা অফশোর ফ্লোটিং পিভি প্ল্যাটফর্ম (Jilin No. 2)।
পরিবেশবান্ধব প্রকৌশল ও সামুদ্রিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে তৈরি এই অভিনব প্রকল্পটি বিশ্বজুড়ে সবুজ শক্তির ধারণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
প্রকল্পের নেপথ্য ও ‘জিলিন-২’-এর বিশেষ প্রযুক্তি: এর আগে ২০২৩ সালে সফলভাবে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া ১০ কিলোওয়াটের ‘জিলিন-১’ প্রকল্পের প্রযুক্তিগত সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে এই ‘জিলিন-২’ প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করা হয়েছে।
- যৌগিক বাঁশের ব্যবহার: এই প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে তৃতীয় প্রজন্মের উন্নত ‘বাঁশ-ভিত্তিক ক্ষত টিউব’ (Bamboo-wound tubes) এবং উচ্চ নমনীয়তা সম্পন্ন ফাইবার-রিইনফোর্সড কাঠ-বাঁশ কম্পোজিট উপাদান বা ‘সি ব্যাম্বু পাইপ’।
- যৌথ উদ্যোগ: প্রকল্পটি যৌথভাবে তৈরি করেছে ওয়েনতাই সিআইএমসি র্যাফেলস ওশান টেকনোলজি গ্রুপ, সিআইএমসি অফশোর ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট, চায়না ফরেস্ট্রি গ্রুপ কর্পোরেশন এবং বেইজিং ফরেস্ট্রি ইউনিভার্সিটি।
- চরম পরিবেশ সহনশীলতা: বেইজিং ফরেস্ট্রি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক চি ছুশেংয়ের মতে, সামুদ্রিক পরিবেশের উচ্চ আর্দ্রতা, লবণের কারণে হওয়া ক্ষয় (Corrosion) এবং তীব্র অতিবেগুনি রশ্মি প্রতিরোধ করতে এসব বাঁশ ও কাঠের উপকরণগুলোকে বিশেষ উপায়ে রাসায়নিক ও যান্ত্রিক প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে। ফলে এগুলো প্রচলিত ইস্পাত বা পলিথিনের (HDPE) তুলনায় অনেক বেশি হালকা, টেকসই এবং সাশ্রয়ী।
পরিবেশগত প্রভাব ও কার্বন পদচিহ্ন হ্রাস: প্রচলিত সামুদ্রিক সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ধাতব কাঠামো ও প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে সামুদ্রিক ইকোসিস্টেম ও জলের গুণমানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
- পরিবেশবান্ধব কাঠামো: সিআইএমসি র্যাফেলস জানিয়েছে, বাঁশ একটি শতভাগ বায়ো-ডিগ্রেডেবল ও দ্রুত বর্ধনশীল উপাদান হওয়ায় এই প্ল্যাটফর্মটি সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর ন্যূনতম ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
- গ্রিন এনার্জি উৎপাদন: ইয়ানতাইয়ের এই প্রদর্শনী ঘাঁটিতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ স্থানীয় হাইড্রোজেন, অ্যামোনিয়া এবং মিথানল উৎপাদনকারী একটি প্রদর্শনী প্রকল্পে সরবরাহ করা হচ্ছে। এটি চীনের দ্বৈত কার্বন লক্ষ্যমাত্রা—২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ সর্বনিম্নে নামিয়ে আনা এবং ২০৬০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনে সরাসরি সহায়তা করছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: চীন তার সুবিশাল উপকূলজুড়ে সৌরবিদ্যুতের বিস্তার ঘটাতে বদ্ধপরিকর। এর আগে গত ডিসেম্বরে শানতুংয়ের দোংইং উপকূলে এক গিগাওয়াট ক্ষমতার বিশ্বের বৃহত্তম গতানুগতিক ভাসমান সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করেছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিএইচএন এনার্জি। তবে সেগুলোতে ভারী ইস্পাত ব্যবহার করা হয়েছিল।
বর্তমান সাফল্যের পর সিআইএমসি র্যাফেলস এখন মেগাওয়াট-স্তরের বড় আকারের বাণিজ্যিক প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। পাশাপাশি মেরিন পাইপিং, জাহাজের কাঠামো এবং মরুকরণ রোধে বালুর সঞ্চালন নিয়ন্ত্রণেও এই বাঁশভিত্তিক সবুজ উপাদানের ব্যবহার সম্প্রসারণের কাজ চলছে।
উপসংহার ও গ্রিনপেজ দৃষ্টিভঙ্গি: প্রকৃতির উপাদানকে কাজে লাগিয়ে প্রকৃতি সুরক্ষার এই অভিনব ও দূরদর্শী প্রয়াস বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রচলিত চিন্তাভাবনাকে বদলে দিচ্ছে।
গ্রিনপেজ বিশ্বাস করে, টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে এবং সাগরের জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখে সবুজ শক্তি উৎপাদনের এমন পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবন অন্যান্য দেশের জন্য একটি অনন্য ও অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে।
