বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্ব সম্প্রদায় এক অভূতপূর্ব ঐক্যে উপনীত হয়েছে। ১৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠিত ‘জিরো-এমিশন অ্যাম্বিশন’ (Zero-Emission Ambition) সামিটে বাংলাদেশ, একটি জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে, কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এক অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।
এই সম্মেলনে বাংলাদেশসহ প্রায় ৫০টিরও বেশি দেশ কার্বন নিঃসরণকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার (Net-Zero Emissions) এক সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক জোট গঠন করেছে। এই সম্মেলনে বাংলাদেশ কেবল নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে নিজেদের জাতীয় প্রতিশ্রুতিই পুনর্ব্যক্ত করেনি, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ‘জলবায়ু ন্যায়বিচার’ (Climate Justice) এবং ক্ষতিপূরণ তহবিলের (Loss and Damage Fund) দাবিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে অত্যন্ত জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছে।
জোটের বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান: এই নবগঠিত ‘জিরো-এমিশন অ্যাম্বিশন’ জোটের মূল লক্ষ্যমাত্রা ও বাংলাদেশের সম্মেলনে গৃহীত কৌশলগত অবস্থান নিম্নরূপ:
- কার্বন নিরপেক্ষতার সমন্বিত রোডম্যাপ: জোটের দেশগুলো ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণকে সম্পূর্ণরূপে নিরপেক্ষ (Carbon Neutral) করার লক্ষ্যে একটি সমন্বিত রোডম্যাপ প্রণয়ন করেছে। এই রোডম্যাপ অনুযায়ী, জীবাশ্ম জ্বালানির (Fossil Fuels) ব্যবহার পর্যায়ক্রমে এবং দ্রুততার সাথে বন্ধ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি (Renewable Energy) যেমন – সৌর, বায়ু, এবং জলবিদ্যুৎ-এর উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা অর্জনের উপর জোর দেওয়া হবে। বাংলাদেশ এই লক্ষ্য অর্জনে নিজেদের জাতীয় পরিকল্পনাকে আরও উচ্চাভিলাষী করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে এবং উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও আর্থিক সহায়তা আদায়ের জন্য আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালো লবিং অব্যাহত রাখবে।
- নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণ ও জাতীয় প্রসারে দৃঢ় পদক্ষেপ: সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল বিশেষভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের উপর জোর দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কেবল অঙ্গীকারই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।” বাংলাদেশ সরকার জাতীয় পর্যায়ে সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির জন্য নতুন প্রকল্প গ্রহণ এবং বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি, গ্রিড-সংযুক্ত নয় এমন প্রত্যন্ত অঞ্চলে সোলার হোম সিস্টেম এবং ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পে সৌরশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধিতে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
- জলবায়ু ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ তহবিলের দাবি পুনর্ব্যক্ত: সম্মেলনে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য একটি কার্যকর ও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ তহবিল (Loss and Damage Fund) গঠনের উপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলো, যারা কার্বন নিঃসরণে প্রায় কোনও অবদান রাখেনি, অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতির শিকার হচ্ছে, তাদের জন্য এই ক্ষতিপূরণ আদায়কে একটি নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যারা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী, তাদেরই এর ক্ষতিপূরণ বহন করতে হবে। আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে চাই।”
উপসংহার ও গ্রিনপেজ-এর পর্যবেক্ষণ: বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ‘জিরো-এমিশন অ্যাম্বিশন’ জোটের গঠন একটি অত্যন্ত ইতিবাচক এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
গ্রিনপেজ মনে করে, এই আন্তর্জাতিক উদ্যোগ বাংলাদেশসহ সকল উন্নয়নশীল দেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তা লাভের এক সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ যদি এই সম্মেলনে গৃহীত অঙ্গীকারসমূহ বাস্তবায়নে আন্তরিক হয় এবং নিজেদের জাতীয় নীতি ও কর্মপরিকল্পনাকে আরও সুসংহত করে, তবে তা কেবল দেশের পরিবেশগত সুরক্ষাই নিশ্চিত করবে না, বরং বৈশ্বিক জলবায়ু কূটনীতিতে এক শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করবে। এই আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারগুলো বাংলাদেশের সবুজ ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
