নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেছেন। বাংলায় দেওয়া এই ভাষণে তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনের জন্য ‘থ্রি-আর’ (3R) কৌশল তুলে ধরার পাশাপাশি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান এবং বৈশ্বিক জলবায়ু ন্যায়বিচারের পক্ষে অত্যন্ত জোরালো ও দ্ব্যর্থহীন অবস্থান ব্যক্ত করেছেন।
যুদ্ধ ও সংঘাত এড়িয়ে কূটনীতির ওপর জোর
ভাষণের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শহীদ এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, মানবসৃষ্ট সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে অশান্তি ও মানবিক সংকট তৈরি হচ্ছে। যুদ্ধ ও জ্বালানি নিরাপত্তা সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও।
যেকোনো সংঘাতের সমাধানে মারণাস্ত্রের ব্যবহার পরিহার করে আলোচনা, কূটনীতি, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং মানবতাকে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে জাতিসংঘকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী।
ফিলিস্তিন ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে দ্ব্যর্থহীন অবস্থান
ফিলিস্তিন সংকটে বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ন্যায্য দাবির পক্ষে বাংলাদেশ সর্বদা সোচ্চার থাকবে।
অন্যদিকে, রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও নিরাপত্তাগত চাপ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে বাংলাদেশ। এই সংকটের মূল উৎস মিয়ানমারে থাকায়, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই এর একমাত্র সমাধান। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখার এবং স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ পুনর্গঠনে ‘থ্রি-আর’ কৌশল
দেশের অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনের রূপরেখা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, দীর্ঘ শাসন-শোষণের জঞ্জাল দূর করে দেশ পুনর্গঠনে বর্তমান সরকার Recovery, Restoration and Reconstruction অর্থাৎ ‘পুনরুদ্ধার, পুনর্বহাল ও পুনর্গঠন’ (থ্রি-আর) কৌশল বাস্তবায়ন করছে।
গুম, খুন, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের মতো অপরাধের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ আজ নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রায় পা রেখেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য কেবল নির্বাচনী গণতন্ত্র নয়, বরং অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন নিশ্চিত করা; যেন উন্নয়নের সুফল প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছায়। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির সুফল সবার জন্য উন্মুক্ত করার ওপরও তিনি জোর দেন।

জলবায়ু ন্যায়বিচার ও সিওপি৩১-এ জোরালো পদক্ষেপের দাবি
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পরিবেশগত ঝুঁকি ও জলবায়ু সংকটের বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান অত্যন্ত নগণ্য হলেও এ দেশের মানুষকে জলবায়ু পরিবর্তনের চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। আসন্ন ‘সিওপি৩১’ (COP31) সম্মেলনে জলবায়ু ন্যায়বিচার, পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়ন এবং সহজ শর্তে তহবিল ছাড়করণের ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের অভ্যন্তরীণ সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনাগুলো তুলে ধরে তিনি জানান:
-
মেগা বৃক্ষরোপণ: পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে দেশব্যাপী ২৫ কোটি গাছ লাগানোর উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
-
পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা: বন্যা ও খরা মোকাবিলায় প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল পুনঃখনন কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি তিস্তা মহাপরিকল্পনা, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এবং সুন্দরবনে মিষ্টি পানির প্রবাহ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সবার আগে বাংলাদেশ—সবার জন্য বাংলাদেশ
ভাষণের সমাপ্তিলগ্নে প্রধানমন্ত্রী তরুণ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের অধিকার আদায় এবং অভ্যন্তরীণ উন্নয়নের এই সমন্বিত রূপরেখা বিশ্ববাসীর সামনে দেশের ভাবমূর্তিকে আরও উজ্জ্বল করেছে। তাঁর এই ভাষণের মূল স্লোগান ছিল—‘সবার আগে বাংলাদেশ—সবার জন্য বাংলাদেশ।’
গ্রিনপেজ দৃষ্টিভঙ্গি: বৈশ্বিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের এই জোরালো অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে দেশের অধিকার আদায়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গ্রিনপেজ বিশ্বাস করে, উন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা স্বীকার করে দ্রুত জলবায়ু তহবিল ছাড় এবং অভ্যন্তরীণ ‘থ্রি-আর’ কৌশলের সফল বাস্তবায়নই ঝুঁকিপূর্ণ ডেল্টা অঞ্চলের মানুষের টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।
