বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা এবং কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো টেকসই ও পরিবেশ-বান্ধব উপায়ে শক্তি সঞ্চয় (Energy Storage) করা। প্রচলিত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি পরিবেশের ওপর এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদী চাপ তৈরি করে, কারণ এর কাঁচামাল খনি থেকে উত্তোলন এবং রিসাইক্লিং প্রক্রিয়া বেশ জটিল।
এই পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালের মে মাসে বিশ্ব বিজ্ঞান মহলে এক নজিরবিহীন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে সম্পূর্ণ জ্বালানিবিহীন শক্তি সঞ্চয়নের এক নতুন প্রযুক্তি। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের হাত ধরে আবিষ্কৃত এই পদ্ধতিটি মূলত মানব শরীরের ডিএনএ (DNA) কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা সৌর শক্তিকে রাসায়নিক বন্ধনীতে আটকে রাখতে সক্ষম।
মানব ত্বক ও ডিএনএ-র জৈবিক বিস্ময় এই যুগান্তকারী গবেষণার নেপথ্যে রয়েছে এক সাধারণ অথচ গভীর পর্যবেক্ষণ। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান্তা বারবারার (UCSB) প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. গ্রেস হান যখন দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া ভ্রমণে যান, তখন নিজের ত্বকে রোদে পোড়ার (Sunburn) অনুভূতি থেকে তাঁর মাথায় এই আইডিয়াটি আসে।
প্রকৃতিতে লাখ লাখ বছরের বিবর্তনের ফলে আমাদের ত্বকের ডিএনএ অণুগুলো সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি (UV) রশ্মি থেকে শরীরকে রক্ষা করতে এক বিশেষ প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা তৈরি করেছে। সূর্যের কড়া আলো যখন ত্বকে পড়ে, তখন ডিএনএ অণুগুলো তাদের স্বাভাবিক সোজা আকৃতি পরিবর্তন করে সংকুচিত বা বিকৃত হয়ে যায়।
পরবর্তীতে ‘ফোটোলাইজ’ (Photolyase) নামক এক বিশেষ এনজাইমের সহায়তায় তারা আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে। ড. হান ভাবলেন, অণুর এই আকৃতি পরিবর্তনের মাধ্যমে যদি শক্তিকে ধরে রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মুক্ত করা যায়, তবে তা হবে জ্বালানি সংকটের এক স্থায়ী সমাধান।
মলিকুলার সোলার থার্মাল এনার্জি স্টোরেজ (MOST) বিজ্ঞানীরা এই বিশেষ ধারণাকে প্রযুক্তিতে রূপান্তর করে এর নাম দিয়েছেন ‘মলিকুলার সোলার থার্মাল এনার্জি স্টোরেজ’ (MOST)। এই ব্যবস্থার কার্যপদ্ধতিকে একটি সাধারণ ইঁদুর ধরার কলের (Mouse Trap) সাথে তুলনা করা যেতে পারে।
একটি ইঁদুর ধরার কলকে যেভাবে বাইরে থেকে শক্তি প্রয়োগ করে লক করে রাখা হয় এবং ট্রিগার চাপলে সেই শক্তি মুহূর্তের মধ্যে মুক্ত হয়; ঠিক তেমনি এই অণুগুলো সূর্যের আলো শোষণ করে নিজেদের অবয়ব বদলে ফেলে এবং শক্তির এক একটি ক্ষুদ্র ‘ফাঁদ’ বা পকেটে পরিণত হয়।
যখনই এই অণুগুলোকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য কোনো উদ্দীপক বা ট্রিগার ব্যবহার করা হয়, তখনই ভেতরে জমা থাকা তাপশক্তি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বাইরে নির্গত হয়। গবেষণাগারে ড. হান এবং তাঁর দল দেখিয়েছেন, এই তরল অণুর মিশ্রণটি একটি ছোট পাত্রে থাকা পানিকে চোখের পলকে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম।
লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির চেয়েও কার্যকর এই প্রযুক্তির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর অবিশ্বাস্য শক্তি ঘনত্ব (Energy Density)। পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটি অব বার্সেলোনার গবেষক ক্যাসপার মথ-পলসেনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ড. হানের উদ্ভাবিত এই মলিকুলার সিস্টেমটি প্রতি কেজিতে প্রায় ১.৬৫ মেগাজুল (MJ) শক্তি সঞ্চয় করতে পারে।
বর্তমান বিশ্বে আমাদের スマートফোন, ল্যাপটপ কিংবা বৈদ্যুতিক গাড়িতে (EV) যে উন্নত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়, এই নতুন প্রযুক্তির শক্তি ঘনত্ব তার চেয়েও অনেক বেশি। তাছাড়া, এই অণুগুলো ওজনে অত্যন্ত হালকা হওয়ায় তা বহনযোগ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। কম্পিউটার মডেলিংয়ের মাধ্যমে ইউসিএলএ-এর (UCLA) অধ্যাপক কেন্ডাল হাউক এই অণুগুলোর কার্যকারিতা আগে থেকেই নিখুঁতভাবে অনুমান করতে সক্ষম হয়েছিলেন, যা এই গবেষণার সাফল্যকে ت্বরান্বিত করেছে।
বর্তমান সীমাবদ্ধতা ও বিজ্ঞানীদের চ্যালেঞ্জ যেকোনো নতুন প্রযুক্তির মতোই গবেষণাগারের এই সাফল্যকে বাণিজ্যিকভাবে বাজারে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ বা সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা নিয়ে বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী মহল কাজ করছে।
- আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সীমাবদ্ধতা: ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী জন গ্রিফিনের মতে, এই অণুগুলোকে সক্রিয় বা চার্জ করতে প্রায় ৩০০ ন্যানোমিটারের অত্যন্ত তীব্র অতিবেগুনি (UV) রশ্মির প্রয়োজন হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, সূর্যের এই কড়া অতিবেগুনি রশ্মির খুব সামান্য অংশই বায়ুমণ্ডল ভেদ করে পৃথিবীতে পৌঁছায়।
- রাসায়নিক ট্রিগারের জটিলতা: বর্তমানে অণু থেকে শক্তি বা তাপ মুক্ত করার জন্য ট্রিগার হিসেবে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের (HCl) মতো অত্যন্ত ক্ষয়কারী রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য নিরাপদ নয়।
- যান্ত্রিক স্থায়িত্ব: ইউনিভার্সিটি অব ডুইসবার্গ-এসেনের বৈজ্ঞানিক পরিচালক হ্যারি হোস্টারের মতে, এই আলোক-সংবেদনশীল তরল অণুগুলোকে কার্যক্ষম রাখতে অত্যন্ত পাতলা স্তরে ছড়িয়ে দিতে হয়। এই তরল যখন বিভিন্ন পাইপ বা পাম্পের মাধ্যমে সঞ্চালিত করা হয়, তখন যান্ত্রিক ঘর্ষণের কারণে ডিভাইসের ভেতরের অংশ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: ‘স্মার্ট উইন্ডো’ ও সলিড-স্টেট প্রযুক্তি এই সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে উঠতে বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে এর উন্নত সংস্করণ নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। বিজ্ঞানী জন গ্রিফিন এবং গ্রেস হান বর্তমানে এই তরল প্রযুক্তির পরিবর্তে একটি ‘সলিড স্টেট’ বা কঠিন পদার্থের আবরণ তৈরি করার চেষ্টা করছেন।
যদি এটি সফল হয়, তবে এই অণুগুলোর প্রলেপ দিয়ে এক ধরনের বিশেষ কোটিং বা ফিল্ম তৈরি করা যাবে, যা ঘরের জানালার কাচে লাগানো সম্ভব হবে। একে বলা হচ্ছে ‘স্মার্ট উইন্ডো’। এই জানালাগুলো গ্রীষ্মকালে সূর্যের তীব্র আলো ও তাপ শোষণ করে ঘরকে ঠাণ্ডা রাখবে এবং সেই শক্তি নিজের ভেতরে জমা রাখবে।
পরবর্তীতে শীতকালে যখন ঘর গরম করার প্রয়োজন হবে বা জানালার কাচে কুয়াশা জমবে, তখন একটি নিরাপদ ট্রিগার বা সুইচের মাধ্যমে সেই জমানো তাপ ছেড়ে দেওয়া হবে। এর ফলে শীতপ্রধান দেশগুলোতে হিটার বা গিজারের পেছনে যে বিপুল পরিমাণ বৈদ্যুতিক শক্তি অপচয় হয়, তা শূন্যে নেমে আসবে।
পরিবেশ ও জলবায়ু সচেতন পোর্টাল ‘গ্রিনপেজ’-এর পাঠকদের জন্য এই আবিষ্কারটি একটি অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা বহন করে। আমরা যখন খনিজ তেল, কয়লা কিংবা প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প খুঁজছি, তখন প্রকৃতির বুক থেকেই (ডিএনএ-র মেকানিজম) এই সমাধান বেরিয়ে এসেছে।
২০২৬ সালের এই বৈজ্ঞানিক ব্রেকথ্রু প্রমাণ করে যে, আগামী দিনের পৃথিবী হবে সম্পূর্ণ কার্বন-মুক্ত এবং ব্যাটারি-নির্ভরশীলতার বাইরে এক নতুন শক্তির পৃথিবী।
যদিও এটি এখনো বাণিজ্যিক বিপণনের প্রাথমিক ধাপে রয়েছে, তবে সঠিক অর্থায়ন এবং আরও গবেষণার মাধ্যমে এই মলিকুলার এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম বিশ্বজুড়ে গ্রিন এনার্জি রূপান্তরকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করবে।
