বিশ্বব্যাপী জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, বাস্তুতন্ত্রের অবক্ষয় এবং প্রকৃতিনির্ভর মানবকল্যাণের ওপর বাড়তে থাকা চাপের প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) নতুন করে বিশ্বসম্প্রদায়কে সতর্ক করেছে যে, প্রকৃতি এখন এক গভীর সংকটে রয়েছে এবং এই সংকট মোকাবিলায় কেবল প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়—প্রয়োজন দ্রুত, কার্যকর ও অর্থবহ বাস্তবায়ন।
২৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে UNEP-এর ‘Updates on nature, land and biodiversity’ পেইজে প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে বলা হয়, বিশ্বের আনুমানিক ৮০ লাখ উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতির মধ্যে প্রায় ১০ লাখ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে, আর বাস্তুতন্ত্রের অবক্ষয় বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের কল্যাণকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইয়েরেভান, আর্মেনিয়ায় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সম্মেলন COP17-এ দেশেরা কুনমিং-মন্ট্রিয়াল গ্লোবাল বায়োডাইভার্সিটি ফ্রেমওয়ার্কের অর্ধমেয়াদি অগ্রগতি পর্যালোচনা করছে এবং ২০৩০ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নতুন গতি আনার কৌশল নিয়ে আলোচনা করছে।
UNEP-এর তথ্যে আরও বলা হয়েছে, এবারের COP-এ প্রথমবারের মতো দেশগুলো যৌথভাবে কুনমিং-মন্ট্রিয়াল ফ্রেমওয়ার্কের অগ্রগতি পর্যালোচনা করছে। ২০২২ সালে গৃহীত এই বৈশ্বিক কাঠামোর ২৩টি লক্ষ্য বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের ক্ষতিগ্রস্ত স্থল ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ৩০ শতাংশ সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য স্থির করা হয়েছিল। কিন্তু এখনো অনেক দেশই সেই পথে পর্যাপ্ত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।
সম্মেলনের মূল বার্তা ও অগ্রাধিকার: ২৬ অক্টোবরের আপডেটে UNEP যে বিষয়গুলো সামনে এনেছে, তা বিশ্ব জীববৈচিত্র্য নীতিতে নতুন চাপ তৈরি করছে।
- প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তর:
UNEP ও অংশীদাররা বলছে, জীববৈচিত্র্য রক্ষার ঘোষণা এখন আর যথেষ্ট নয়। স্থানীয় পর্যায়, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, নারীরা ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায় যেন নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের কেন্দ্রস্থলে থাকে—এটি বিশেষভাবে জরুরি। কারণ জীববৈচিত্র্য হ্রাসের অভিঘাত সবচেয়ে বেশি তাদের ওপরই পড়ে। - অর্থায়ন ও বেসরকারি বিনিয়োগের ব্যবহার:
একই দিনে অনুষ্ঠিত ‘Finance and Biodiversity Day’-এ UNEP বলেছে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বেসরকারি অর্থায়নের নতুন যন্ত্র ও আর্থিক মডেলকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। তবে বিনিয়োগ যেন শুধু মুনাফামুখী না হয়ে ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংরক্ষণে সহায়ক হয়, সেটিও গুরুত্ব পেয়েছে। - অধিকারভিত্তিক সংরক্ষণ পদ্ধতি:
UNEP-এর আরেকটি আলোচনায় বলা হয়েছে, Kunming-Montreal Global Biodiversity Framework বাস্তবায়নে rights-based approaches অপরিহার্য। পরিবেশগত ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, জবাবদিহি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ছাড়া কার্যকর সংরক্ষণ সম্ভব নয়। - আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়:
UNEP আরও জানিয়েছে, সমুদ্রতীর, সীমানা-অতিক্রমী আবাসস্থল, অভিবাসী প্রজাতি এবং যৌথ বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় অঞ্চলভিত্তিক সহযোগিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জলজ ও স্থলজ পরিবেশ কোনো দেশের সীমারেখা মানে না।
বর্তমান বৈশ্বিক অবস্থা ও উদ্বেগ: UNEP-এর হালনাগাদে বলা হয়, বিশ্বের জীববৈচিত্র্য-সংকট কেবল বন উজাড় বা প্রজাতি হারানোর গল্প নয়; এটি পানি, খাদ্য, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও জলবায়ু-সহনশীলতার ওপরও সরাসরি আঘাত।
প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের অবক্ষয় মানুষের জীবিকা, পুষ্টি, দুর্যোগ প্রতিরোধ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, জমি অবক্ষয়, দূষণ এবং জীববৈচিত্র্য ক্ষয়—এই চারটি সংকট একে অপরের সঙ্গে জড়িত এবং এককভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়।
এ কারণেই UNEP-এর বার্তা হলো: প্রকৃতি রক্ষার কাজকে খণ্ড খণ্ড উদ্যোগ হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত বৈশ্বিক কর্মসূচি হিসেবে এগোতে হবে। জাতীয় স্তরে নীতি, অর্থায়ন, গবেষণা ও স্থানীয় অংশগ্রহণের মধ্যে সংযোগ না ঘটলে ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কঠিন হবে।
ইয়েরেভান COP17-এর তাৎপর্য:
UNEP-এর তথ্য অনুযায়ী, ইয়েরেভানের COP17 সম্মেলন কুনমিং-মন্ট্রিয়াল ফ্রেমওয়ার্কের অর্ধপথের মূল্যায়ন। অর্থাৎ, ২০৩০ লক্ষ্যের পথে দেশগুলো কতটা এগিয়েছে, কোথায় ঘাটতি রয়েছে, এবং কীভাবে তা দ্রুত পূরণ করা যায়—এসব নিয়ে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই সম্মেলনে ‘Yerevan Pathway’ নামে একটি ত্বরান্বিত কর্মপথের আলোচনা চলছে, যা ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য নীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এই পথনির্দেশ শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে আরেক দফা বিলম্ব হবে। কিন্তু যদি দেশগুলো আর্থিক প্রতিশ্রুতি, নীতিগত সংস্কার, স্থানীয় ক্ষমতায়ন এবং অবকাঠামোগত সমন্বয় একসঙ্গে করে, তবে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় একটি বাস্তব অগ্রগতি সম্ভব।
উপসংহার ও গ্রিনপেজ দৃষ্টিভঙ্গি: গ্রিনপেজ মনে করে, ২৬ অক্টোবর ২০২৬-এর UNEP আপডেট বিশ্বকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—প্রকৃতি রক্ষার সময় এখনই।
জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, বাস্তুতন্ত্রের অবক্ষয় ও মানবকল্যাণের সংকট সমাধানে শুধু সম্মেলন নয়, কার্যকর বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং অধিকারভিত্তিক সংরক্ষণ নীতি অপরিহার্য। কুনমিং-মন্ট্রিয়াল ফ্রেমওয়ার্ককে সফল করতে হলে প্রতিটি দেশকে এখন নিজেদের জাতীয় নীতি ও বাজেটকে প্রকৃতি-সুরক্ষার দিকে আরও শক্তভাবে ঘোরাতে হবে।
