27 C
ঢাকা, বাংলাদেশ
[bam103Mondayam_310410Asia/Dhaka] | [Asia/Dhaka103Monday041703_26am31Asia/Dhaka] খ্রিস্টাব্দ | [bam103Mondayam_26am31Asia/Dhaka] বঙ্গাব্দ
গ্রীন পেইজ
বাংলাদেশে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার (SRHR) চ্যালেঞ্জ: নীতি থেকে প্রয়োগ পর্যন্ত
নিকোলাস বিশ্বাস পরিবেশ গবেষণা

বাংলাদেশে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার (SRHR) চ্যালেঞ্জ: নীতি থেকে প্রয়োগ পর্যন্ত

– নিকোলাস বিশ্বাস 

যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার (SRHR) মানুষের মর্যাদা, লিঙ্গ সমতা ও টেকসই উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। অথচ বাংলাদেশে এখনো লক্ষ লক্ষ নারী, কিশোরী ও তরুণ-তরুণী সঠিক তথ্য পাওয়া, সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা লাভ করা এবং নিজেদের প্রজনন সংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছেন।

পরিবার পরিকল্পনা ও মাতৃস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে অগ্রগতি দৃশ্যমান হলেও, সামাজিক কুসংস্কার, বাল্যবিবাহ এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতাগুলো এখনো রয়ে গেছে। SRHR কেবল একটি স্বাস্থ্যগত বিষয়ই নয়, বরং এটি অধিকার, ন্যায়বিচার ও উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিষয়।

বাংলাদেশে SRHR বিষয়ক পরিষেবাগুলো সরকারি সংস্থা, আন্তর্জাতিক সংগঠন, বেসরকারি সংস্থা (বা) এবং বেসরকারি খাতের অংশীদারদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বহুমুখী কাঠামোর মাধ্যমে প্রদান করা হয়।

যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার (SRHR):

সবার জন্য অধিকার, মর্যাদা ও পছন্দের নিশ্চয়তা SRHR হলো এমন একটি ধারণা, যার মাধ্যমে প্রত্যেকে তাদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে কোনো প্রকার অন্যায় আচরণ, চাপ বা ক্ষতির সম্মুখীন না হয়ে স্বাধীনভাবে ও বিচক্ষণতার সাথে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

SRHR-এর চারটি মূল দিক হলো:
  • যৌন স্বাস্থ্য: যৌনতার সাথে সম্পর্কিত শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার প্রসার ঘটানো।
  • প্রজনন স্বাস্থ্য: পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃস্বাস্থ্য সেবা, নিরাপদ প্রসব এবং অন্যান্য প্রজনন স্বাস্থ্য সেবার সুযোগ নিশ্চিত করা।
  • যৌন অধিকার: শারীরিক স্বায়ত্তশাসন, মর্যাদা, গোপনীয়তা, সমতা এবং যৌন সহিংসতা থেকে মুক্ত থাকার মতো ব্যক্তিগত অধিকারগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
  • প্রজনন অধিকার: সন্তান নেওয়া বা না নেওয়া, কখন সন্তান নেওয়া হবে এবং কয়টি সন্তান নেওয়া হবে—সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা; পাশাপাশি সঠিক তথ্য ও উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ রাখা।
SRHR যেসব ক্ষেত্রে অপরিহার্য:
  • মাতৃমৃত্যু ও অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ রোধ করা।
  • গর্ভনিরোধক সামগ্রী ও পরিবার পরিকল্পনা সেবার সুযোগ নিশ্চিত করা।
  • কিশোর-কিশোরীদের বাল্যবিবাহ, যৌন নির্যাতন ও শোষণ থেকে রক্ষা করা।
  • লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ করা এবং এর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
  • লিঙ্গ সমতা, মানবাধিকার ও নারীর ক্ষমতায়নের প্রসার ঘটানো।
  • নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশে SRHR মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নতি, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, পরিবার পরিকল্পনা সেবার প্রসার এবং নারী, কিশোরী ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় সহায়তা করে।

মাতৃস্বাস্থ্য: প্রতিটি নারীর কাছে পৌঁছানো

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস’ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মাতৃমৃত্যুর হার ছিল প্রতি ১ লাখ জীবিত জন্মে ১৩৬ জন, যা আগের বছর ছিল ১৫৩ জন।

অথচ অধিকাংশ মাতৃমৃত্যুই প্রতিরোধযোগ্য। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, অল্প বয়সে গর্ভধারণ এবং দক্ষ ধাত্রী বা প্রসব সহায়তাকারীর অভাবই মূলত এর প্রধান কারণ। এছাড়া জরায়ুমুখের ক্যান্সার এবং অবস্টেট্রিক ফিস্টুলা (প্রসবজনিত জটিলতায় সৃষ্ট ক্ষত) নারীর স্বাস্থ্য ও মর্যাদাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

গ্রামীণ, দুর্গম এবং নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর নারীরাই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। চিকিৎসা ব্যয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দূরবর্তী অবস্থান, প্রশিক্ষিত পেশাজীবীর অভাব এবং জরুরি সেবার ক্ষেত্রে বিলম্ব—সব মিলিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

তাই কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং গর্ভাবস্থায়, প্রসবের পরে ও গর্ভপাত-পরবর্তী যথাযথ সেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সাশ্রয়ী জরুরি প্রসূতি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে নারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, গোপনীয়তা রক্ষা এবং কোনো ধরনের বৈষম্য না করা নিশ্চিত করতে হবে।

বাল্যবিবাহ ও কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য

‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে’ অনুযায়ী, ২০–২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭.২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর বয়সের আগে এবং প্রায় ১৩ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর বয়সের আগে। দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতি, দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং ক্ষতিকর সামাজিক প্রথা আমাদের দেশে বাল্যবিবাহের হার বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এর পরিণতিও খুব দ্রুত নেমে আসে। ১৫–১৯ বছর বয়সী প্রতি ১ হাজার কিশোরীর মধ্যে ১১৩ জন সন্তান জন্ম দিচ্ছে—যা সাব-সাহারা আফ্রিকার বাইরে বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ হার। কিশোরীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো গর্ভাবস্থা ও প্রসবজনিত জটিলতা। বাল্যবিবাহের ফলে কিশোরীদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, তাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সংকুচিত হয় এবং নিজের শরীর ও জীবনের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়।

এছাড়া, বয়োপযোগী যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষার অভাব কিশোর-কিশোরীদের আরও বিপন্ন করে তুলছে। বয়ঃসন্ধি, গর্ভনিরোধক পদ্ধতি, সম্মতি (কনসেন্ট) এবং বিভিন্ন সংক্রমণ—এসব বিষয় অনেক পরিবার ও শ্রেণিকক্ষে এখনো নিষিদ্ধ বা ‘ট্যাবু’ হিসেবে গণ্য হয়।

ফলে তরুণ-তরুণীরা ভুল তথ্য বা গুজবের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়, যার উৎস প্রায়শই হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। তাই বিদ্যালয়, পরিবার ও সমাজকে সম্মিলিতভাবে সঠিক ও সংস্কৃতিসম্মত তথ্য প্রদান করতে হবে, যা ভয়ের পরিবর্তে নিরাপত্তা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তুলবে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDG) ৫.৩ নম্বর লক্ষ্য অনুযায়ী, সরকার ইউএনএফপিএ (UNFPA) ও ইউনিসেফের (UNICEF) সাথে মিলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহ নির্মূল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এখন এই প্রতিশ্রুতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পরিবার পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার

বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনার বিষয়টি একটি সফলতার গল্প। বর্তমানে আধুনিক গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হার প্রায় ৬২ শতাংশ; তবে এই হার এখন আর বাড়ছে না এবং অঞ্চলভেদে এর তারতম্য রয়েছে—যেমন চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে ব্যবহারের হার তুলনামূলকভাবে কম। গর্ভনিরোধক পদ্ধতিগুলোর মধ্যে পিল সবচেয়ে জনপ্রিয় (বিবাহিত নারীদের প্রায় ২৯ শতাংশ এটি ব্যবহার করেন), অথচ দীর্ঘমেয়াদী ও স্থায়ী পদ্ধতির ব্যবহারের হার মাত্র ৮ শতাংশের মতো।

ইউএনএফপিএ (UNFPA)-এর সহায়তায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে চালু হওয়া ‘জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কৌশল ২০২৫–২০৩০’-এর মূল লক্ষ্য হলো—জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ধারণা থেকে সরে এসে অধিকারভিত্তিক ক্ষমতায়নের দিকে মনোযোগ দেওয়া।

২০২৬ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার চালানোর এক বছরব্যাপী একটি কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এই কর্মসূচির প্রকৃত সার্থকতা নির্ভর করবে এর ওপর যে, এটি কি কেবল লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপ সৃষ্টি করবে, নাকি প্রশিক্ষিত পরামর্শদাতা ও বিভিন্ন ধরনের গর্ভনিরোধক পদ্ধতির মাধ্যমে নারীদের প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ করে দেবে? পরিবার পরিকল্পনা হলো—সন্তান নেওয়া হবে কি না, কখন নেওয়া হবে এবং কয়টি সন্তান নেওয়া হবে—সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা।

মাসিক নিয়মিতকরণ (Menstrual Regulation) এবং গর্ভপাত-পরবর্তী সেবা

১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি অনুযায়ী, কোনো নারীর জীবন বাঁচানোর প্রয়োজন ছাড়া অন্য যেকোনো উপায়ে গর্ভপাত ঘটানো আইনত দণ্ডনীয়। তবে ১৯৭৯ সাল থেকে পরিবার পরিকল্পনা সেবার অংশ হিসেবে ‘মাসিক নিয়মিতকরণ’ বা ‘মেনস্ট্রুয়াল রেগুলেশন’ (এমআর) পদ্ধতি চালু রয়েছে।

এর আওতায় শেষ মাসিকের পর ১০–১২ সপ্তাহ পর্যন্ত ‘ম্যানুয়াল ভ্যাকুয়াম অ্যাসপিরেশন’ (এমভিএ) পদ্ধতিতে অথবা নয় সপ্তাহ পর্যন্ত ওষুধের মাধ্যমে (এমআরএম) মাসিক নিয়মিতকরণের সুবিধা পাওয়া যায়।

বাস্তব ক্ষেত্রে, এই সেবা পাওয়ার সুযোগ সব জায়গায় সমান নয়। প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের স্বল্পতা, সামাজিক কলঙ্ক এবং কারা এই সেবা পাওয়ার যোগ্য—সে বিষয়ে সচেতনতার অভাবের কারণে অনেক নারী অনিরাপদ সেবা প্রদানকারীদের শরণাপন্ন হন। এদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীতে রক্তপাতসহ নানা শারীরিক জটিলতার কারণে চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার সম্মুখীন হন।

এই সেবাগুলোর দায়িত্ব বিভিন্ন দপ্তরে বিভক্ত; এমআর কার্যক্রমটি ‘পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর’-এর আওতাধীন, অন্যদিকে গর্ভপাত-পরবর্তী সেবা পরিচালনা করে ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তর’। এই বিভাজন সেবা কার্যক্রমের সমন্বয়ে ঘাটতি তৈরি করতে পারে।

তাই স্বেচ্ছায় পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণের পাশাপাশি, অনুমোদিত এমআর সেবা এবং সহানুভূতিশীল ও বিচারবুদ্ধিহীন দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন (non-judgmental) গর্ভপাত-পরবর্তী সেবাকে আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

যৌনবাহিত সংক্রমণ প্রতিরোধ

সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভি (HIV)-এর হার কম হলেও গনোরিয়া, সিফিলিস এবং অন্যান্য যৌনবাহিত সংক্রমণ জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে। নারী যৌনকর্মী, সমকামী পুরুষ, ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি এবং যারা ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করেন—তাদের মধ্যে এই সংক্রমণের হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

অনেকেই এসব সংক্রমণ সম্পর্কে খুব কম জানেন; আবার সামাজিক লজ্জার ভয়ে অনেকে পরীক্ষা (টেস্টিং) করাতে চান না। এর পরিবর্তে তারা ফার্মেসি বা অনানুষ্ঠানিক সেবা প্রদানকারীদের কাছে যান, যার ফলে প্রায়শই ভুল রোগ নির্ণয়ের ঝুঁকি থাকে।

বিভিন্ন এনজিও এবং ইউএনএফপিএ (UNFPA) সচেতনতা বৃদ্ধি ও পরীক্ষার কর্মসূচি পরিচালনা করলেও, এই কার্যক্রমের পরিধি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। গোপনীয়তা বজায় রেখে সাশ্রয়ী ও বৈষম্যহীন সেবা প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া, জনসচেতনতামূলক প্রচারণায় কাউকে দোষারোপ না করে বরং রোগ প্রতিরোধ এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া উচিত।

নীতির ঘাটতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা

বাংলাদেশে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার (SRHR) বিষয়ক কোনো একক জাতীয় নীতিমালা নেই; বরং এর বিভিন্ন দিক ‘জাতীয় জনসংখ্যা নীতি ২০১২’ এবং ‘জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি ২০১১’-এর মতো বিভিন্ন নথিপত্রে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। প্রধান ঘাটতিগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • অবিবাহিত কিশোর-কিশোরীরা অনেকাংশেই সেবার আওতার বাইরে থেকে যায়, কারণ বিদ্যমান সেবা ব্যবস্থায় বিবাহিত দম্পতি এবং মাতৃস্বাস্থ্যের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
  • প্রজনন স্বাস্থ্যের বিভিন্ন সূচকের তুলনায় যৌন স্বাস্থ্য এবং মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার ওপর কম গুরুত্ব দেওয়া হয়।
  • পুরুষদের সাধারণত সেবার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হয় না, ফলে গর্ভনিরোধের দায়িত্ব মূলত নারীদের ওপরই বর্তায়।
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, যৌন ও লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের জন্য বিশেষায়িত সেবার অভাব রয়েছে।
  • সামাজিক ট্যাবু (কুসংস্কার), শিক্ষকদের অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং রাজনৈতিক বাধার কারণে বিদ্যালয় পর্যায়ে ‘জীবন দক্ষতা শিক্ষা’ (life-skills education) কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করা রয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সেবা প্রদান করলেও, গোপনীয়তা রক্ষা এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে তারা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হলো সামগ্রিক যৌন শিক্ষা (comprehensive sexuality education) পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা, কিন্তু এ ক্ষেত্রে তদারকি অত্যন্ত দুর্বল।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় বাল্যবিবাহ রোধ এবং নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ে কাজ করে; তবে পুলিশের সাথে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে তাদের কার্যকারিতা সন্তোষজনক নয়। জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, প্রতি দশজন বিবাহিত নারীর মধ্যে প্রায় সাতজনই তাদের সঙ্গীর দ্বারা সহিংসতার শিকার হন। এছাড়া, বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রেও অধিকারভিত্তিক প্রশিক্ষণের চেয়ে মাতৃস্বাস্থ্য সংক্রান্ত উপকরণের ওপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের জন্য যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা প্রয়োজন, যা মাতৃস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, তরুণদের স্বাস্থ্য, ঋতুস্রাব ব্যবস্থাপনা, যৌনবাহিত সংক্রমণ (STI) প্রতিরোধ, সহিংসতা বন্ধ করা এবং শিক্ষা প্রদানের মতো বিষয়গুলোকে সমন্বিত করবে। এই পরিকল্পনায় সেবার সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতির উন্নয়ন এবং বৈষম্য বা নিম্নমানের সেবা সংক্রান্ত অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকা আবশ্যক।

সরকার, সুশীল সমাজ এবং ইউএনএফপিএ (UNFPA), ইউনিসেফ (UNICEF), ইউএনএইডস (UNAIDS), এফএইচআই ৩৬০ (FHI 360), আইপাস বাংলাদেশ (Ipas Bangladesh), সেভ দ্য চিলড্রেন (Save the Children), এমএসআই রিপ্রোডাক্টিভ চয়েসেস (MSI Reproductive Choices), আইপিপিএফ (IPPF), পপুলেশন কাউন্সিল (Population Council), রাড্ডা বারনেন (Radda Barnen), অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (OGSB), রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ সার্ভিসেস ট্রেনিং অ্যান্ড এডুকেশন প্রোগ্রাম (RHSTEP)-এর মতো উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি; পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই অর্থায়ন।

ভবিষ্যৎ করণীয়: মর্যাদা ও উন্নয়নের প্রশ্ন

এ ক্ষেত্রে পাঁচটি পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

  • প্রথমত, সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় মাতৃ ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা।
  • দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয়, কমিউনিটি এবং নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বয়সোপযোগী যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা (SRHR education) চালু করা।
  • তৃতীয়ত, বাল্যবিবাহ এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
  • চতুর্থত, গর্ভনিরোধক ব্যবস্থা, মাসিক নিয়মিতকরণ (মেনস্ট্রুয়াল রেগুলেশন), গর্ভপাত-পরবর্তী সেবা এবং যৌনবাহিত সংক্রমণ (এসটিআই) বিষয়ক গোপনীয়তাপূর্ণ সেবাগুলো কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়াই সবার জন্য সহজলভ্য করতে হবে।
  • পঞ্চমত, নারী, কিশোর-কিশোরী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে তাদের জন্য প্রণীত কর্মসূচিগুলোর পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

অগ্রগতিকে কেবল জাতীয় গড়ের ভিত্তিতে বিচার করা উচিত নয়; বরং দেখতে হবে যে, সবচেয়ে দরিদ্র নারী এবং সবচেয়ে প্রান্তিক অবস্থানে থাকা ব্যক্তিটি প্রয়োজনে যথাযথ সেবা পাচ্ছেন কি না।

নারীরা যখন প্রতিরোধযোগ্য কারণে মৃত্যুবরণ করেন এবং কিশোরীরা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসে, তখন বাংলাদেশের পক্ষে তার উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব নয়। আমাদের লক্ষ্য হলো—এমন আরও বেশি ক্লিনিক গড়ে তোলা এবং এমন একটি সমাজ গঠন করা, যেখানে তথ্য সহজে পাওয়া যায়, সেবাগুলো স্বল্পমূল্যে পাওয়া যায়, গোপনীয়তা সুরক্ষিত থাকে এবং প্রজনন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো নিরাপদে ও স্বাধীনভাবে নেওয়া যায়।

এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার, বিনিয়োগ এবং ক্ষতিকর সামাজিক প্রথাগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সাহস। একজন নারীর স্বাস্থ্য, একজন কিশোরীর ভবিষ্যৎ এবং প্রতিটি মানুষের প্রজনন সংক্রান্ত স্বায়ত্তশাসন—এগুলো কোনো বিশেষ সুবিধা বা অনুগ্রহ নয়; বরং এগুলো মানুষের মৌলিক অধিকার।

(অনুবাদিত)

নিকোলাস বিশ্বাস
একজন মিডিয়া ফ্রিল্যান্সার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী।

“Green Page” কে সহযোগিতার আহ্বান

সম্পর্কিত পোস্ট

Green Page | Only One Environment News Portal in Bangladesh
Bangladeshi News, International News, Environmental News, Bangla News, Latest News, Special News, Sports News, All Bangladesh Local News and Every Situation of the world are available in this Bangla News Website.

এই ওয়েবসাইটটি আপনার অভিজ্ঞতা উন্নত করতে কুকি ব্যবহার করে। আমরা ধরে নিচ্ছি যে আপনি এটির সাথে ঠিক আছেন, তবে আপনি ইচ্ছা করলেই স্কিপ করতে পারেন। গ্রহন বিস্তারিত