পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থায় বর্তমানে এক উদ্বেগজনক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া ‘এল নিনো’ (El Niño) ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে অত্যন্ত শক্তিশালী রূপ ধারণ করেছে।
জুলাই ২০২৬-এর সর্বশেষ বৈশ্বিক জলবায়ু প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১.৭° থেকে ২° সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই ‘সুপার এল নিনো’ পরিস্থিতি কেবল বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি নয়, বরং খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশের জন্য এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এল নিনো ও লা নিনার বৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপট: প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা যখন স্বাভাবিকের চেয়ে অস্বাভাবিক উষ্ণ হয়ে ওঠে, তখন তাকে এল নিনো বলা হয়। আর এর বিপরীত অবস্থা, যখন সমুদ্রের পানি শীতল থাকে, তাকে বলা হয় লা নিনা।
বর্তমান ২০২৬ সালে আমরা একটি শক্তিশালী এল নিনো পর্যায় অতিক্রম করছি। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা একে একটি ‘বিবর্তনীয় সংকট’ হিসেবে দেখছেন, কারণ এটি সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের পারস্পরিক ক্রিয়াকে অস্বাভাবিকভাবে ত্বরান্বিত করে তুলেছে।
২০২৬ সালের জুলাই মাসের বৈশ্বিক পরিস্থিতি: বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সাম্প্রতিক আপডেটে নিশ্চিত করেছে যে, এল নিনোর তীব্রতা জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে দ্রুত বৃদ্ধি পাবে।
প্রশান্ত মহাসাগরের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বিশ্বব্যাপী চরম তাপমাত্রা (Heatwaves), অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং সামুদ্রিক ঝড় (হারিকেন ও টাইফুন) বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভূ-মধ্যরেখীয় অঞ্চলের প্রায় সব দেশে এর প্রভাব ইতিমধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশে এল নিনোর প্রভাব: অনিশ্চয়তা ও বাস্তবতা: বাংলাদেশে এল নিনোর প্রভাব সবসময় সরাসরি ও এককভাবে নির্ধারিত হয় না। ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, এল নিনোর বছরগুলোতে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাতের তারতম্য দেখা যায়। তবে ২০২৬ সালের এই শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতির ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ ঝুঁকি পরিলক্ষিত হচ্ছে:
- মৌসুমি বায়ুর ওপর প্রভাব: এল নিনোর প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগরে মেঘ সৃষ্টির প্রবণতা পরিবর্তিত হয়ে যায়, যা দক্ষিণ এশীয় মৌসুমি বায়ুকে দুর্বল করে দিতে পারে। ফলে বর্ষাকালে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার বা দীর্ঘমেয়াদী খরার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
- তাপপ্রবাহ: এল নিনোর ফলে বাংলাদেশের ভূ-ভাগের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা গত কয়েক মাসে তীব্র তাপপ্রবাহের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।
- ভিন্নধর্মী প্রভাব: গবেষণায় দেখা গেছে, সব এল নিনো বছরেই বাংলাদেশে যে খরা হয় তা নয়; বরং ২০১৫-১৬ সালের শক্তিশালী এল নিনোর সময়ও বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়েছিল। এর কারণ হলো বঙ্গোপসাগরের নিজস্ব তাপমাত্রা, ভারত মহাসাগরীয় ডাইপোল (IOD) এবং আঞ্চলিক নিম্নচাপের উপস্থিতি, যা এল নিনোর প্রভাবকে অনেক সময় প্রশমিত বা পরিবর্তিত করে দেয়।
কেন শুধুমাত্র এল নিনো দিয়ে বাংলাদেশের আবহাওয়া বিচার করা কঠিন? বাংলাদেশে আবহাওয়ার ধরন নির্ধারণে এল নিনো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হলেও এটি একমাত্র নিয়ন্ত্রক নয়। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এখানে মাডেন-জুলিয়ান অসিলেশন (MJO), বঙ্গোপসাগরের উত্তাল অবস্থা এবং স্থানীয় বায়ুপ্রবাহের শক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তাই এল নিনো শুরু হলেই বাংলাদেশে তীব্র খরা হবে—এই ধারণাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। বরং এটি আঞ্চলিক জলবায়ু উপাদানের সাথে মিলিত হয়ে একটি জটিল আবহাওয়ার ধরন তৈরি করে।
২০২৬ সালের এই শক্তিশালী এল নিনো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের কোনো ঘটনা নয়, বরং বর্তমানের বাস্তবতা। শক্তিশালী এই আবহাওয়া চক্রের ফলে কেবল বাংলাদেশের আবহাওয়া নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার পুরো কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা ও পানি ব্যবস্থাপনা হুমকির মুখে রয়েছে।
আমাদের করণীয় হলো এল নিনো সংক্রান্ত তথ্যের ওপর নিয়মিত নজর রাখা এবং জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ও অবকাঠামো তৈরির দিকে মনোযোগ দেওয়া। গ্রিনপেজ সবসময় পরিবেশগত এই জটিল পরিবর্তনের বস্তুনিষ্ঠ ও বিজ্ঞানসম্মত তথ্য আপনাদের সামনে তুলে ধরবে।
সূত্র: বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO), আইআরআই (IRI) এবং আবহাওয়া পূর্বাভাস কেন্দ্র, জুলাই ২০২৬।
