উন্নয়ন ও পরিবেশ প্রতিদ্বন্দ্বী নয়: ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, নদী রক্ষা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রধানমন্ত্রীর জোর
জলবায়ু পরিবর্তনের চরম অভিঘাত এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতার এই সময়ে টেকসই উন্নয়নের অন্যতম চাবিকাঠি হলো সবুজায়ন। বাংলাদেশকে একটি ‘সবুজ, স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ বসতি’ হিসেবে গড়ে তুলতে উন্নয়ন এবং পরিবেশকে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে প্রকৃতির সঙ্গে সম্প্রীতি রেখে সমৃদ্ধি অর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
একই সঙ্গে তিনি বন উজাড়, পাহাড় কাটা, ম্যানগ্রোভ ধ্বংস এবং বন্যপ্রাণী নিধনের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী কেবল গাছ লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেননি, বরং পরিবেশ সংরক্ষণকে উন্নয়ন দর্শনের মূল ভিত্তি হিসেবে ঘোষণা করে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ আবাসস্থল গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই ২০২৬) সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস, পরিবেশ মেলা এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
এ বছর জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলার প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘বৃক্ষ রোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশকে একটি সত্যিকারের ‘সবুজ বসতি’ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য দেশব্যাপী সামাজিক আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন।
‘সবুজ বসতি’ গড়তে আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগাবে সরকার: প্রধানমন্ত্রী
নায়ন ও সবুজায়নে বর্তমান সরকারের মেগা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে দেশে নতুন করে ২৫ কোটি গাছ রোপণের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।” তবে যত্রতত্র গাছ লাগানোর বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, “ইচ্ছেমতো গাছ লাগালে এই লক্ষ্য পূরণ হবে না, রোপণ করা গাছটি নিরাপদে বেড়ে উঠছে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে।” তিনি বলেন:
- পরিবেশ নির্বাচন: কোন পরিবেশে, কোন মাটিতে কেমন গাছ লাগানো উচিত, তা মাথায় রাখতে হবে। তবে প্রধানমন্ত্রী এক্ষেত্রে বিজ্ঞানের প্রয়োগের ওপর জোর দিয়েছেন।
- প্রজাতির নির্বাচন: পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর গাছগুলো অবশ্যই পরিহার করে দেশীয় প্রজাতির গাছ—যেমন ঔষধি, অর্কিড, বাঁশজাতীয় বনজ, ফলদ, অর্থকরী বা বিপন্ন প্রজাতির গাছ লাগাতে হবে।
- মাটি ও জলবায়ু উপযোগিতা: প্রতিটি অঞ্চলের মাটির ধরন ও জলবায়ু বুঝে গাছ নির্বাচন করা জরুরি।
- মাদার ট্রি রক্ষা: বনাঞ্চলের স্থানীয় ইকোসিস্টেমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরিচিত । বন বিভাগের কর্মকর্তাদের কড়া নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যুগ যুগ ধরে স্থানীয় ইকোসিস্টেমের অংশ হয়ে থাকা গাছ, যেগুলোকে আমরা ‘মাদার ট্রি’ (মাতৃবৃক্ষ) বলি, সেগুলো যেন কোনোভাবেই কাটা না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।”
- এটি কেবল একটি বাৎসরিক আনুষ্ঠানিকতা নয়: বৃক্ষরোপণকে কেবল একটি বাৎসরিক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে না দেখে একে নিত্যদিনের অভ্যাস এবং জীবনযাপনের অংশ হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
নবজাতকের জন্য গাছ ও তরুণদের সম্পৃক্ততা
বৃক্ষরোপণকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী এক অভিনব উদ্ভাবনী প্রস্তাব তুলে ধরে বলেন, “পরিবারে নতুন সদস্যের আগমন ঘটলে বা প্রিয়জনের যেকোনো জন্মজয়ন্তীকে স্মরণীয় করে রাখতে একটি করে গাছ রোপণ করা হোক।
পরিবারে নতুন সন্তান জন্ম নিলে, তা নিজেদের হোক বা আত্মীয়স্বজনের, আমরা যদি সেই নবজাতককে স্মরণ করে একটি গাছ রোপণ করি, তাহলে শিশুটির পাশাপাশি গাছটিও বেড়ে উঠবে।” তাঁর মতে, শিশুর বেড়ে ওঠার সাথে সাথে রোপিত গাছটিও বড় হবে, যা একটি সুস্থ পরিবেশগত ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার পাশাপাশি সবুজায়নের সামাজিক আন্দোলনকে সফল করবে।
তরুণ প্রজন্মকে পরিবেশ রক্ষায় কাজে লাগানোর সরকারি উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘গ্রিন ভলান্টিয়ারিজম’ চালু করেছি।
সম্প্রতি স্কুলগুলোতে একযোগে প্রায় ৯০ হাজার গাছ রোপণ করা হয়েছে। এছাড়া তরুণদের জন্য ‘ক্লাইমেট ইউথ ফেলোশিপ’ এবং ‘এনভায়রনমেন্ট স্টার্ট-আপ ফান্ড’ চালু করা হয়েছে, যা সবুজ বাংলাদেশ গঠনে বড় ভূমিকা রাখবে।”
২০ হাজার কি.মি. নদী খনন ও ইকোসিস্টেম রক্ষা
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত (ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ, লবণাক্ততা) মোকাবিলায় পরিবেশকে আলাদা খাত নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা যদি নদীগুলো বাঁচাতে না পারি, তাহলে আগামীতে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেবে। কৃষি, খাদ্য ও পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।”
তিনি জানান, দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন-পুনঃখনন কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার, যা কৃষকদের বছরজুড়ে সেচ সুবিধা দেবে।
পাশাপাশি ছাদবাগান, নগর বনায়ন, জিআইএস (GIS) ভিত্তিক বৃক্ষরোপণ, নদীতীর সবুজায়ন এবং ইকো-ট্যুরিজমকে অর্থনীতির নতুন ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলার রূপরেখাও তুলে ধরেন তিনি।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ‘থ্রি আর’ (3R) নীতি ও নাগরিকদের প্রতি আহ্বান
পরিবেশ রক্ষায় কেবল বৃক্ষরোপণই যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী নগর, বন্দর ও শহরতলির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তনের ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, “প্লাস্টিক বর্জ্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সরকার কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি জৈব সার উৎপাদন, পুনর্ব্যবহার, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন এবং ‘রিডিউস, রি-ইউজ, রিসাইকেল’ (3R) নীতি জাতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
জনসাধারণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে কেবল নগর প্রশাসন বা পুলিশের মাধ্যমে শৃঙ্খলায় আনা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন। আমি সবার কাছে অনুরোধ করছি, যেখানে-সেখানে ময়লা বা উচ্ছিষ্ট ফেলবেন না।”
জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং জলাভূমি ভরাটের কারণে বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে উল্লেখ করে এসব প্রাণীকে যেকোনো উপায়ে বাঁচানোর তাগিদ দেন তিনি।
পুরস্কার প্রদান ও মেলা পরিদর্শন
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘জাতীয় বৃক্ষরোপণ পুরস্কার-২০২৫’ এবং ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ জাতীয় পুরস্কার-২০২৬’ বিজয়ীদের হাতে তুলে দেন। এছাড়া সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির অংশীজনদের মাঝে লভ্যাংশের চেক বিতরণ করেন।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী সাইমুম পারভেজ এবং মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ফাহমিদা খানম। আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রধানমন্ত্রী ঘুরে ঘুরে বৃক্ষমেলার বিভিন্ন স্টল ও প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন।
