নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
নদী রক্ষা, দূষণ প্রতিরোধ এবং নিরাপদ নৌপথের দাবিতে রাজধানী ঢাকায় এক বর্ণাঢ্য সাইকেল শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ ২৩ মে (শনিবার) ‘জাতীয় নদী দিবস’ উপলক্ষে “নোঙর ট্রাস্ট” এবং “বাংলাদেশ সাইকেল লেন বাস্তবায়ন পরিষদ”-এর যৌথ উদ্যোগে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
সকাল ৯টায় রাজধানীর সোয়ারীঘাটের বুড়িগঙ্গা মঞ্চ থেকে সাইকেল শোভাযাত্রাটি শুরু হয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে এসে শেষ হয়। এতে বিভিন্ন সংগঠনের শতাধিক সাইক্লিস্ট স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং নদী দূষণ, দখল ও নৌপথের অনিরাপত্তার বিরুদ্ধে জনসচেতনতামূলক বার্তা ছড়িয়ে দেন।
কর্মসূচির উদ্বোধন করেন নোঙর ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা ও নদী আন্দোলনের সংগঠক সুমন সামস। এসময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সাইকেল লেন বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি আমিনুল ইসলাম টুববুস, বুড়িগঙ্গার মঞ্চের জাতীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য কামরুল হাসান চৌধুরী বিপু, কেরানীগঞ্জ ইউনাইটেড সাইক্লিস্টের সভাপতি রফিকুল হাসান এবং চকবাজার সাইক্লিস্টের নির্বাহী সদস্য কায়সার আহমেদসহ সাইক্লিং সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
শোভাযাত্রা শেষে সকাল সাড়ে ১০টায় নোঙর ট্রাস্টের আয়োজনে এক বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের বিশিষ্টজন, পরিবেশবিদ, নদী গবেষক এবং সরকারের নীতি-নির্ধারকেরা অংশগ্রহণ করেন। সভায় “জনসম্পৃক্ত নদী ব্যবস্থাপনা” শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রিভারাইন পিপল-এর মহাসচিব শেখ রোকন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পানিসম্পদ মন্ত্রী মোঃ শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, “নদী বাঁচলে বাঁচবে দেশের কৃষি, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ—নদীর সঙ্গে এ দেশের ভাগ্য নিবিড়ভাবে জড়িত।”
তিনি জানান, দেশে প্রায় ১৪১৫টি ছোট-বড় নদী রয়েছে এবং এর প্রতিটিই একেকটি জীবন্ত সত্তা। নদী ব্যবস্থাপনায় জনগণের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে বাস্তবসম্মত প্রকল্প গ্রহণের ওপর জোর দেন মন্ত্রী। ফারাক্কা ব্যারেজের ক্ষতিকর প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন,
এর ফলে দেশের ২৪টি জেলার প্রায় ৭ কোটি মানুষ মরুকরণের ঝুঁকিতে রয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়নে কাজ করছে। এছাড়াও আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল, নদী ও জলাধার খনন এবং পুনঃখননের সরকারি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মাদারীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য আনিছুর রহমান খোকন বলেন, “নদী রক্ষা মানেই দেশের অস্তিত্ব রক্ষা করা। নদীপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।”
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন নদী গবেষক আইরিন সুলতানা, কসমস সমাজ উন্নয়ন সংস্থার প্রধান নির্বাহী মেহনাজ পারভীন মালা, ওয়ারপোর মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলমগীর এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর সাংগঠনিক সম্পাদক মিহির বিশ্বাসসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
বক্তারা দেশের নৌ-নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, গত ৫৪ বছরে দেশের বিভিন্ন নৌপথে ছোট-বড় দুর্ঘটনায় ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুম ও ঈদকেন্দ্রিক যাত্রায় নৌপথের এই অনিরাপত্তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। ২০০৪ সালের ২৩ মে চাঁদপুরের মেঘনা নদীতে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক লঞ্চ দুর্ঘটনার স্মৃতি স্মরণ করে প্রতি বছর এই দিনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে “জাতীয় নদী দিবস” হিসেবে ঘোষণার জোর দাবি জানায় নোঙর ট্রাস্ট।
পরিবেশবাদীরা মনে করেন, নদী রক্ষা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচেতন ও সম্পৃক্ত করার একটি জাতীয় দায়িত্ব। তাদের মতে, নদীগুলোকে দখল ও দূষণমুক্ত করে একটি নিরাপদ নৌপথ নিশ্চিত করতে পারলেই নৌদুর্ঘটনায় নিহত হাজারো মানুষের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে উপস্থিত সকলেই একমত পোষণ করেন যে, “নদী বাঁচলে বাঁচবে বাংলাদেশ”—এটি কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং এটি এ দেশের অস্তিত্ব রক্ষার এক অবিরাম সংগ্রাম।
