চলতি ২০২৬ সালের মে মাসের এক উদ্বেগজনক আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তে, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোয় (DR Congo) নতুন করে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে ‘বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ (Public Health Emergency of International Concern – PHEIC) হিসেবে ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)।
কঙ্গোর প্রত্যন্ত এবং বনাঞ্চল সংলগ্ন এলাকাগুলোতে এই ভাইরাসের আক্রমণে ইতিমধ্যে ৮০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীদের মতে, এই বিপর্যয়টি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন চিকিৎসাগত সংকট নয়, বরং এর গভীর সংযোগ রয়েছে কঙ্গো অববাহিকার লাগামহীন বন উজাড় এবং বিশ্বব্যাপী চলমান জলবায়ু সংকটের তীব্র অভিঘাতের সাথে।
পরিবেশবিষয়ক পোর্টাল ‘গ্রিনপেজ’-এর পাঠকদের জন্য এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব কীভাবে পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা এই ধরণের অতিমারিকে বারবার উসকে দিচ্ছে।
সংকট ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বোচ্চ সতর্কতা: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালকের দেওয়া সাম্প্রতিক বিশেষ বিবৃতি অনুযায়ী, কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় রেইনফরেস্ট সংলগ্ন এলাকা থেকে এই নতুন স্ট্রেইনের ইবোলা ভাইরাসের উৎপত্তি।
আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার অত্যন্ত বেশি হওয়ায় এবং অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এই সংক্রমণ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকায় এই সর্বোচ্চ বৈশ্বিক সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এর আগে ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের ইবোলা মহামারী বিশ্ববাসীকে যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করেছিল, ২০২৬ সালের এই প্রাদুর্ভাব যেন তারই নতুন এবং শক্তিশালী রূপ।
ডব্লিউএইচও জরুরি ভিত্তিতে কঙ্গো এবং সাব-সাহারা অঞ্চলে বিশেষ মেডিকেল টাস্কফোর্স এবং ভ্যাকসিন বিতরণ টিম পাঠালেও, দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, স্থানীয় অবকাঠামোর অভাব এবং চরম আবহাওয়া এই লড়াইকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলছে।
বন নিধন ও জুনোটিক স্পিলওভার (Zoonotic Spillover): ভাইরাসের মানুষের শরীরে প্রবেশ: পরিবেশ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ইবোলার মতো জুনোটিক ভাইরাসের (যা বন্যপ্রাণী থেকে মানুষের শরীরে ছড়ায়) বারবার ফিরে আসার প্রধান কারণ হলো আফ্রিকার চিরহরিৎ বনাঞ্চল ধ্বংস করা।
কঙ্গো অববাহিকাকে পৃথিবীর অন্যতম প্রধান ‘কার্বন সিঙ্ক’ বা অক্সিজেনের উৎস ধরা হলেও, খনিজ সম্পদ উত্তোলন, কাঠ পাচার এবং বাণিজ্যিক কৃষিজমির সম্প্রসারণের জন্য প্রতিদিন হাজার হাজার একর প্রাচীন বনভূমি কেটে পরিষ্কার করা হচ্ছে।
-
আবাসস্থল ধ্বংস: বনের ভেতরের গভীর বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হওয়ার ফলে ইবোলা ভাইরাসের প্রাকৃতিকভাবে ক্ষতিকর নয় এমন বাহক—যেমন ফলখেকো বাদুড় (Fruit Bats) এবং শিম্পাঞ্জি বা গরিলাদের মতো প্রাইমেট প্রজাতির প্রাণীরা তাদের আদি বাসস্থান ও খাদ্যের উৎস হারাচ্ছে।
-
লোকালয়ে অনুপ্রবেশ: বাসস্থান হারিয়ে এই বন্যপ্রাণীগুলো খাদ্যের সন্ধানে মানুষের লোকালয়ের কাছাকাছি চলে আসছে এবং গ্রামীণ ফলদ বাগান বা ফসলি জমিতে বিচরণ করছে। এর ফলে বন্যপ্রাণীর লালা বা মলমূত্র থেকে অতি সহজেই ভাইরাসটি মানুষের সংস্পর্শে চলে আসছে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘জুনোটিক স্পিলওভার’।
জলবায়ু পরিবর্তন ও ভাইরাসের আচরণগত রূপান্তর: ২০২৬ সালের বৈশ্বিক ক্লাইমেট মডেলগুলো দেখাচ্ছে যে, আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত বন্যপ্রাণীদের অভিবাসন ও বেঁচে থাকার ধরণ আমূল বদলে দিচ্ছে।
দীর্ঘস্থায়ী খরা কিংবা আকস্মিক অতিবৃষ্টির কারণে বাদুড় বা অন্যান্য বন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রাকৃতিক নিয়মে দুর্বল হয়ে পড়ে। এই শারীরিক দুর্বলতার সুযোগে তাদের শরীরে সুপ্ত থাকা ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি ও কার্যকারিতা বহুগুণ বেড়ে যায় এবং তারা বেশি পরিমাণে ভাইরাস ছড়াতে শুরু করে।
পরিবেশের এই চরম ভাবাপন্ন অবস্থা ভাইরাসের নতুন মিউটেশন বা রূপান্তরকেও ত্বরান্বিত করতে পারে, যা বিদ্যমান ইবোলা ভ্যাকসিনগুলোর কার্যকারিতাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়।
বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া এবং ‘ওয়ান হেলথ’ (One Health) ধারণার প্রয়োজনীয়তা: ইবোলার এই নতুন প্রাদুর্ভাব বিশ্বকে আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, মানব স্বাস্থ্যকে পরিবেশ এবং বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্য থেকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। জাতিসংঘ এবং বিশ্বব্যাংক ইতিমধ্যে পরিবেশ-বান্ধব সমন্বিত স্বাস্থ্য নীতি বা ‘ওয়ান হেলথ’ ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়নে জোর দিচ্ছে।
-
অর্থায়নের সংকট ও আন্তর্জাতিক উদাসীনতা: আফ্রিকায় চলমান এই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও স্বাস্থ্য তহবিল পুনর্গঠন অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং উন্নত দেশগুলোর নিজস্ব অর্থনৈতিক রক্ষণশীলতার কারণে এই বৈশ্বিক জরুরি তহবিলে অর্থায়ন থমকে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে, যা অনুন্নত ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে আরও বেশি বিপদে ফেলছে।
-
প্রযুক্তির আধুনিক ব্যবহার: ডব্লিউএইচও এবং স্থানীয় পরিবেশ গবেষকরা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত স্যাটেলাইট ম্যাপিং ব্যবহার করছেন। এর মাধ্যমে বনের কোন কোন অংশে বন্যপ্রাণীদের বিচরণ পরিবর্তন হচ্ছে এবং কোথায় স্পিলওভারের ঝুঁকি সর্বোচ্চ, তা রিয়েল-টাইমে ট্র্যাক করে আগাম সতর্কতা জারির ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
কঙ্গোর এই নতুন ইবোলা সংকট মানব সভ্যতার জন্য একটি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা। আমরা যদি নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থে ক্রমাগত প্রকৃতিকে ধ্বংস করে বন্যপ্রাণীর সীমানায় হানা দিতে থাকি, তবে প্রকৃতি এই ধরণের ভয়াবহ ভাইরাসের মাধ্যমে তার পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাবেই।
গ্রিনপেজ-এর পক্ষ থেকে আমরা মনে করি, ইবোলার মতো মহামারী থেকে স্থায়ী মুক্তি পেতে হলে শুধু ল্যাবরেটরিতে কোটি কোটি ডলার খরচ করে ভ্যাকসিন তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; বরং পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত কঙ্গো কিংবা আমাজনের মতো রেইনফরেস্টগুলোকে সম্পূর্ণ আইনি সুরক্ষার আওতায় এনে অক্ষত রাখতে হবে। প্রকৃতির টেকসই সুরক্ষাই কেবল পারে মানুষের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য ও অস্তিত্ব নিশ্চিত করতে।
