গত ২৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে নেপাল ও চীন সীমান্তবর্তী তিব্বত সংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে ঘটা ভয়ংকর হিমবাহ ধস (Glacial Collapse) এবং এর ফলে সৃষ্ট আকস্মিক বিধ্বংসী বন্যার (Flash Flood) ঘটনায় পরিস্থিতি আরও বেশি শোচনীয় হয়ে উঠেছে।
লাংটাং ন্যাশনাল পার্কের লাংটাং লিরুং পর্বতমালা সংলগ্ন এলাকায় সংঘটিত এই মহাপ্রলয়ে লাংটাং ও ত্রিসূলী নদীর অববাহিকায় নেমে আসা পানির প্রবল স্রোত ও ডেবরিস ফ্লো পুরো উত্তর ও মধ্য নেপালের বিস্তীর্ণ জনপদ লন্ডভন্ড করে দিয়েছে।
আজকের (২ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে নেপালে মৃতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ১,১২৭ জনে দাঁড়িয়েছে এবং ৪,৮০০-এরও বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর এটিই নেপালের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক বিপর্যয়।
উদ্ধার কার্যক্রম ও মানবিক সংকটের নতুন চিত্র: দুর্যোগের এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড, ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার কারণে উদ্ধারকর্মীদের পক্ষে অনেক দূরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া অঞ্চলগুলোতে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
- বিদেশি নাগরিক ও তীর্থযাত্রীদের নিখোঁজ হওয়া: নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকায় বহু দেশি-বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী রয়েছেন। চীন ও নেপাল সীমান্তসংলগ্ন গ্যিরং পোর্ট (Gyirong Port) এবং তিমুরে বাজার এলাকা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে সেখানে আটকে পড়া বহু ভারতীয় ও অন্যান্য দেশের নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। ভারতসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য ড্রেন, ডিএনএ টেস্ট কিট এবং বিশেষ টিম প্রেরণ করেছে।
- স্বাস্থ্য ও খাদ্য সংকট: জাতিসংঘের শিশু তহবিল (UNICEF) ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) জানিয়েছে যে, হাজার হাজার মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের বাইরে রয়েছেন। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, শিশু এবং তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য জরুরি চিকিৎসা ও খাবার সরবরাহ করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি, বন্যা কবলিত এলাকার পানি দূষিত হয়ে পড়ায় পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
- অর্থনৈতিক ক্ষতি: নেপালের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি ও বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এই বিপর্যয়ের ফলে দেশটির গ্রামীণ অর্থনীতি, পর্যটন এবং প্রায় ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক হিসেবে দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বৈশ্বিক সতর্কতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব: জাতিসংঘের জলবায়ু ও পরিবেশ বিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা যেভাবে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কার্বন নিঃসরণ কমানো না হলে আগামিতে এ ধরনের হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে না।
উপসংহার ও গ্রিনপেজ দৃষ্টিভঙ্গি: হিমালয়ের কোলঘেঁষা এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি কেবল নেপাল বা চীন নয়, বরং গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ু নিরাপত্তার জন্য এক কঠিন ও বড় ধরনের হুঁশিয়ারি। গ্রিনপেজ মনে করে, অবিলম্বে পাহাড়ি অববাহিকাগুলোতে অত্যাধুনিক ক্রসবর্ডার আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম বা আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি।
