বিশ্বজুড়ে যখন চরম তাপমাত্রা, দাবদাহ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির আলোচনা তুঙ্গে, তখন অবমূল্যায়িত হয়ে থাকা আরেকটি নীরব ও ভয়াবহ পরিবেশগত সংকট মানুষের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলছে—তা হলো ‘ভূমির অবক্ষয় এবং মরুকরণ’।
মঙ্গোলিয়ার উলানবাটরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ মরুকরণ রোধ সংক্রান্ত কনভেনশনের (UNCCD COP17) উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিজ্ঞানী ও বিশ্ব নেতারা সতর্ক করেছেন যে, পৃথিবীর প্রায় ৪০ শতাংশ ভূমি আজ অবক্ষয় ও খরার কবলে পড়েছে, যা বিশ্ববাসীর খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সংকটের পরিধি ও পরিবেশগত প্রভাব:
জাতিসংঘের পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ভূমির মরুকরণ কেবল নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত হানছে:
- কোটি মানুষের জীবনজীবিকা বিপন্ন: বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৩২০ কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা অবক্ষয়িত ভূমি এবং তীব্র খরার ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। বিশেষ করে বিশাল প্রাকৃতিক তৃণভূমি বা রেনজল্যান্ডগুলো মারাত্মক ক্ষতির শিকার হওয়ায় গবাদি পশুর খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
- অর্থনৈতিক ক্ষতি ও বৈশ্বিক প্রভাব: ভূমির অবক্ষয় ও খরা বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতি বছর প্রায় ৯০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের আর্থিক ক্ষতিসাধন করছে। এর মধ্যে কেবল খরাজনিত ক্ষতির পরিমাণই বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলার, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
- প্রতিক্রিয়াশীল নীতির পরিবর্তন: এতদিন ধরে খরা বা মরুকরণের মতো সংকট দেখা দিলে কেবল পরবর্তী সময়ে ত্রাণ বা জরুরি সহায়তা দেওয়ার যে সংস্কৃতি ছিল, সেখান থেকে সরে এসে এখন আগাম প্রস্তুতি, আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম এবং টেকসই ভূমি ও পানি ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জোট ২০৩০ সালের মধ্যে ভূমি অবক্ষয় নিরপেক্ষতা (Land Degradation Neutrality) অর্জনে সম্মিলিতভাবে কাজ করার জোরালো প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।
গ্রিনপেজ দৃষ্টিভঙ্গি:
আমাদের পায়ের নিচের মাটি সুস্থ না থাকলে মানব সভ্যতার টিকে থাকাই অসম্ভব হয়ে পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং জীববৈচিত্র্য হ্রাসের সাথে ভূমির অবক্ষয় ও মরুকরণের সমস্যা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই একক কোনো সমস্যা হিসেবে না দেখে, পানি, ভূমি ও জলবায়ু সুরক্ষাকে সমন্বিত উপায়ে মোকাবিলা করার মাধ্যমেই কেবল পৃথিবীকে টেকসই ও বাসযোগ্য রাখা সম্ভব।
গ্রিনপেজ মনে করে, সময় থাকতে বৈশ্বিক এই মরুকরণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে গোটা মানবজাতিকে এক মহাবিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে।
