উন্নয়নের নামে বন ধ্বংসের রাজনীতির ইতি: কক্সবাজারে ৭০০ একর সংরক্ষিত বনভূমি বাতিলের সাহসী পদক্ষেপ
উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ও বনভূমি ধ্বংস করার যে অপরিকল্পিত সংস্কৃতি বিগত সরকারের আমলে জাঁকিয়ে বসেছিল, তা দেশের জীববৈচিত্র্যের জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। এর অন্যতম জ্বলন্ত উদাহরণ ছিল কক্সবাজারের প্রাকৃতিক ও সংরক্ষিত বনভূমিতে ‘বঙ্গবন্ধু জনপ্রশাসন প্রশিক্ষণ একাডেমি’ নির্মাণের জন্য বিশাল এক এলাকা বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত।
পরিবেশবাদী এবং সচেতন মহলের তীব্র সমালোচনার মুখে থাকা সেই বিতর্কিত ও পরিবেশবিনাশী প্রকল্পটি অবশেষে বর্তমান সরকার পুরোপুরি বাতিল করেছে। পরিবেশ রক্ষায় নতুন সরকারের এটি নিঃসন্দেহে অন্যতম একটি যুগান্তকারী ও প্রশংসনীয় অর্জন।
পদক্ষেপ ও বনভূমি পুনরুদ্ধারের নেপথ্য গল্প: প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীর জীবন রক্ষায় নতুন প্রশাসনের আন্তরিক সদিচ্ছার ফলেই এই বিশাল অর্জন সম্ভব হয়েছে:
- বরাদ্দ বাতিল ও বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর: পরিবেশ উপদেষ্টার সরাসরি ও দৃঢ় হস্তক্ষেপে প্রশিক্ষণ একাডেমি নির্মাণের জন্য দেওয়া ৭০০ একর সংরক্ষিত বনভূমির বরাদ্দ সরকারি আদেশে বাতিল করা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মূল্যবান এই জমিটি পুনরায় বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে সেখানে বনায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ অবিলম্বে শুরু করা যায়।
- ভুল সংশোধনের দৃষ্টান্ত: অতীতে সরকারি বা আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে পাহাড় কেটে কিংবা বন উজাড় করে অবকাঠামো তৈরির যে প্রবণতা ছিল, এই সিদ্ধান্ত তার বিরুদ্ধে একটি শক্ত ও স্পষ্ট বার্তা দেয়—রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনেও প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্যকে জিম্মি করা যাবে না।
জীববৈচিত্র্য ও এশিয়ান হাতির করিডোর রক্ষা: কক্সবাজারের ওই নির্দিষ্ট সংরক্ষিত বনভূমি কেবল সাধারণ কোনো গাছপালার সমারোহ নয়; এটি আমাদের জাতীয় বন্যপ্রাণী সুরক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি এলাকা:
- বন্য হাতির নিরাপদ চলাচলের পথ: ওই ৭০০ একর পাহাড়ি ও বনাঞ্চলীয় এলাকাটি বিপন্ন প্রজাতির এশিয়ান হাতির ঐতিহ্যগত ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চলাচলের পথ বা ‘এশিয়ান এলিফ্যান্ট করিডোর’ হিসেবে স্বীকৃত। সেখানে কংক্রিটের বড় কোনো প্রতিষ্ঠান বা একাডেমি নির্মিত হলে হাতির চলাচলের চিরচেনা পথ বন্ধ হয়ে যেত এবং মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যকার সংঘাত চরম আকার ধারণ করত।
- বিরল উদ্ভিদ ও প্রাণীর আশ্রয়: এই অঞ্চলে শত শত প্রজাতির দুর্লভ ও বিলুপ্তপ্রায় গাছপালা, ঔষধি উদ্ভিদ, এবং নানা ধরনের পাখি ও সরীসৃপের বসবাস রয়েছে, যা এই সাহসী সিদ্ধান্তের ফলে চিরতরে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেল।
টেকসই উন্নয়ন বনাম অপরিকল্পিত প্রকল্প: অর্থনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের দোহাই দিয়ে প্রকৃতিকে ধ্বংস করার যে মানসিকতা গড়ে উঠেছিল, এই সিদ্ধান্ত তার আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনের জন্য দেশের অন্তত পঁচিশ শতাংশ বনভূমি থাকা আবশ্যক, যেখানে আমাদের বর্তমান বনভূমি এমনিতেই আশঙ্কাজনক হারে কম। বন বাঁচিয়ে রাখার এই লড়াই কেবল গাছ বাঁচানোর লড়াই নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক জলবায়ু সুরক্ষা ও অস্তিত্বের লড়াই।
গ্রিনপেজ দৃষ্টিভঙ্গি: উন্নয়নের নামে দেশের অমূল্য বনভূমি ধ্বংস করার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের এই বরাদ্দ বাতিলের সিদ্ধান্ত দেশের পরিবেশ আন্দোলনে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
গ্রিনপেজ বিশ্বাস করে, পরিবেশের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নেওয়া এমন সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সবুজ, নিরাপদ ও প্রাণবন্ত পৃথিবী উপহার দিতে পারে।
