২০২৬ সালের ২৪ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক গভীর পরীক্ষার মুখে বিশ্ব ‘জাতিসংঘ দিবস’ পালন করছে। যুদ্ধ সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণের পথে বাধা সৃষ্টি করছে, মানবাধিকারের সুরক্ষা এখনো অসম রয়ে গেছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে অসহায় জনগোষ্ঠীর ওপর পড়ছে সবচেয়ে বেশি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘ (ইউএন) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর লক্ষ্য ছিল আলোচনা, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে ভবিষ্যতে সংঘাত এড়ানো। জাতিসংঘের সনদ কার্যকর হওয়ার ৮১ বছর পরও সেই লক্ষ্য এখনো অপরিহার্য। তবে এর প্রতিষ্ঠার আদর্শ এবং বর্তমান বাস্তবতার মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে: জাতিসংঘ কি এখনো তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে সক্ষম?
একটি সর্বজনীন প্রতিষ্ঠান, অথচ অসম কণ্ঠস্বর
জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রের সংখ্যা ১৯৩টি; এছাড়া ভ্যাটিকান ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র—এই দুটি পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রও এর অন্তর্ভুক্ত। ৫১টি দেশের উদ্যোগে ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর এতে যোগ দেয় এবং ২০১১ সালে দক্ষিণ সুদান ১৯৩তম সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে যুক্ত হয়।
সাধারণ পরিষদে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের সমান ভোটাধিকার থাকলেও, বাস্তবে তাদের প্রভাব সমান নয়—বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের ক্ষেত্রে। মূল প্রশ্নটি এটি নয় যে বিশ্বের জাতিসংঘের প্রয়োজন আছে কি না, বরং প্রশ্ন হলো—সংস্থাটি কীভাবে আরও কার্যকর, প্রতিনিধিত্বমূলক এবং জবাবদিহিমূলক হয়ে উঠতে পারে।
শান্তি কেবল একটি সুদূর প্রতিশ্রুতি হয়ে থাকতে পারে না
বিভিন্ন দেশের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতার কারণে অনেক সময় সংস্থাটির পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যখন সম্মিলিত দায়িত্ববোধের চেয়ে কৌশলগত স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হয়—আর এর খেসারত দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। মানুষ ঘরবাড়ি হারায়, শিশুরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয় এবং লাখ লাখ মানুষ বাধ্য হয় দেশান্তরী হতে।
শান্তি মানে কেবল সংঘাতের অনুপস্থিতি নয়; বরং শান্তি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করবে, যেখানে মানুষ নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবে, ভয়মুক্ত জীবনযাপন করতে পারবে এবং মর্যাদার সঙ্গে নিজেদের জীবন নতুন করে গড়ে তুলতে পারবে।
উত্তেজনা সহিংসতায় রূপ নেওয়ার আগেই জাতিসংঘকে প্রতিরোধমূলক কূটনীতি, আগাম সতর্কবার্তা প্রদান ব্যবস্থা এবং মধ্যস্থতার প্রক্রিয়া আরও জোরদার করতে হবে। নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারও সমান জরুরি। অবহেলিত অঞ্চলগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং বড় ধরনের নৃশংসতার ক্ষেত্রে ভেটো ক্ষমতার প্রয়োগ সীমিত করা গেলে তা সংস্থাটির বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করবে। তবে এ ধরনের সংস্কারের জন্য প্রভাবশালী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে প্রকৃত রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকা প্রয়োজন।
বহুপাক্ষিকতাবাদের ওপর আস্থা পুনরুদ্ধার
ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং জনগণের আস্থার অভাব আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথে বাধা সৃষ্টি করছে। কোনো কোনো সরকার আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোকে নিজেদের ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখে, আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তোলে যে বহুপাক্ষিক গোষ্ঠীগুলো সবার প্রতি সমান আচরণ করে কি না। আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজন ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা এবং দৃশ্যমান ফলাফল। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোকে অবশ্যই জবাবদিহিতার সেই মানদণ্ড মেনে চলতে হবে, যা তারা অন্যদের ওপর আরোপ করতে চায়।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে এই বিভাজনগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। ‘দ্য টাইমস অফ ইসরায়েল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই জাতিসংঘকে একটি “ব্যর্থ সংস্থা” এবং এর কর্মকর্তাদের “গর্বিত পরজীবী” বলে অভিহিত করেন। অন্যদিকে, ‘আনাদোলু এজেন্সি’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এবং ভেটো ক্ষমতা বিলুপ্ত করার আহ্বান জানান।
রাজনৈতিক বিবেচনায় আরোপিত বিধিনিষেধ মানবিক সহায়তা ও জরুরি পরিষেবাগুলোকে ব্যাহত করতে পারে। এর উদ্দেশ্য বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করা নয়, বরং স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং প্রতিশ্রুতি পালনের মাধ্যমে আস্থা ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সাইবার হুমকির মতো চ্যালেঞ্জগুলো প্রমাণ করে যে, কোনো একক জাতি একা বড় ধরনের বৈশ্বিক সমস্যাগুলোর মোকাবিলা করতে পারে না। দায়িত্বশীল বহুপাক্ষিকতাবাদ জাতীয় স্বার্থ এবং মানবজাতির অভিন্ন স্বার্থ—উভয়কেই রক্ষা করতে সহায়তা করে।
মানবাধিকার হতে হবে সর্বজনীন
‘মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র’ মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সমতার একটি সাধারণ মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করেছে। তবুও, এর নীতিগুলো সব জায়গায় সমানভাবে পালিত হয় না। সরকারগুলো প্রায়শই নিজেদের সমালোচনা থেকে বাঁচাতে ‘সার্বভৌমত্ব’-এর দোহাই দেয়। একই সঙ্গে, নজরদারি, অনলাইন সেন্সরশিপ এবং ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ মৌলিক স্বাধীনতার জন্য নতুন নতুন ঝুঁকির সৃষ্টি করছে।
জাতিসংঘের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে রাজনৈতিক পক্ষপাতমুক্ত থেকে মানবাধিকারের ধারাবাহিক সুরক্ষার ওপর। নাগরিকদের নিরাপত্তা, বাকস্বাধীনতা এবং আইনের চোখে সমান অধিকার—এগুলোকে কখনোই রাজনৈতিক দরকষাকষির পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘনের ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া এবং দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি। এভাবেই ন্যায়বিচার রাজনৈতিক চাপের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে।
টেকসই উন্নয়নের জন্য বৈশ্বিক সংহতি
‘২০৩০ এজেন্ডা’ এবং এর ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) দারিদ্র্য, অসমতা, স্বাস্থ্যসেবার অভাব, শিক্ষার ঘাটতি এবং পরিবেশগত ক্ষতি মোকাবিলার একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রদান করে। তবুও, অর্থনৈতিক সংকট, ঋণের বোঝা এবং জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিনিয়ত এই অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে। প্রায়শই দেখা যায়, পরিবেশগত বিপর্যয়ের জন্য যারা সবচেয়ে কম দায়ী, তারাই সবচেয়ে কম সম্পদ নিয়ে এর ধ্বংসাত্মক পরিণতির মুখোমুখি হচ্ছে। জলবায়ু মোকাবিলায় সাশ্রয়ী অর্থায়ন, কার্যকর প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং একটি ন্যায়সংগত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অন্যান্য দেশের সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে। বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার এবং অসহনীয় ঋণের বোঝা লাঘব করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এছাড়া, ধনী দেশগুলোকে জলবায়ু বিষয়ক তাদের প্রতিশ্রুতিগুলোকে অবশ্যই বাস্তব পদক্ষেপের রূপ দিতে হবে।
তবে, কেবল আন্তর্জাতিক সহায়তা উন্নয়নের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। কার্যকর জাতীয় নেতৃত্ব, সুশাসন এবং জবাবদিহিতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের উচিত জাতীয় অগ্রাধিকারগুলোকে সমর্থন করা এবং একই সঙ্গে এটি নিশ্চিত করা যে, উন্নয়নের সুফল যেন সেই জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়, যারা পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ঘোষণা থেকে বাস্তবায়ন
৮১তম অধিবেশনের অগ্রাধিকারমূলক বিষয়—”বিশ্বাস পুনরুদ্ধার ও রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ”—বর্তমান চ্যালেঞ্জটিকে যথার্থভাবে তুলে ধরে। মানুষের জীবনে দৃশ্যমান উন্নতির মাধ্যমেই আস্থা অর্জন করতে হবে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে আরও শক্তিশালী সমন্বয় এবং ফলাফলের জন্য বৃহত্তর জবাবদিহিতা প্রয়োজন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রারম্ভিক সতর্কবার্তা ব্যবস্থা ও জনসেবার মান উন্নত করতে পারে, তবে এর ব্যবহার অবশ্যই মানবাধিকার সুরক্ষার নীতিমালার অধীনে হতে হবে।
দায়িত্ব সবার। সরকারগুলোর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কোনো সংস্থা তাদের সহযোগিতা ছাড়া আন্তর্জাতিক বিভাজন দূর করতে পারে না। সুশীল সমাজ, তরুণ প্রজন্ম এবং সাংবাদিকরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে এবং বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতিগুলোকে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের উচিত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা, আরও ন্যায়সংগত বৈশ্বিক নিয়মনীতির দাবি জানানো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রকৃত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
মানবতার প্রতি নতুন অঙ্গীকার
‘জাতিসংঘ দিবস’ কেবল একটি বার্ষিকী উদযাপনের উপলক্ষ হওয়া উচিত নয়। এটি আমাদের সেই পৃথিবী—যা আমরা গড়তে চাই—এবং মানুষের বর্তমান বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধান নিয়ে আত্মসমালোচনার সুযোগ করে দেয়। জাতিসংঘ নিখুঁত নয়, তবে এমন একটি মঞ্চের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য, যেখানে বিভিন্ন জাতি আলোচনা ও সহযোগিতা করতে পারে। বহুপাক্ষিকতাকে (multilateralism) বর্জন করলে বৈশ্বিক সমস্যার সমাধান হবে না; বরং সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণ আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনারের কার্যালয়ের প্রসঙ্গ টেনে বলা যায়, “শান্তিকে কেবল স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে নয়, বরং মানুষের জীবনে যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, তার মাধ্যমেই পরিমাপ করতে হবে।”
৮১ বছরে পদার্পণ করা জাতিসংঘের জন্য প্রয়োজন এর মূল আদর্শগুলোর প্রতি জোরালো সমর্থন, কাঠামোগত প্রকৃত পরিবর্তন এবং সদস্য দেশগুলোর এমন সদিচ্ছা, যেখানে তারা নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্যের চেয়ে মানুষের কল্যাণকে বেশি গুরুত্ব দেবে। জাতিসংঘের সাফল্য পরিমাপ করতে হলে আমাদের দেখতে হবে—এটি যুদ্ধকবলিত মানুষের দুর্দশা লাঘবে কতটা সহায়তা করছে, মানবাধিকার রক্ষায় কী ভূমিকা রাখছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে কতটা সুযোগ করে দিচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই পৃথিবীকে কতটা বাসযোগ্য করে তুলছে।
বিশ্বের এমন একটি জাতিসংঘ প্রয়োজন, যা কেবল সবার পক্ষে কথা বলবে তা-ই নয়, বরং সবার জন্য কার্যকর ফলাফল বয়ে আনবে। বৈশ্বিক নেতাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে—বিশ্বাস পুনরুদ্ধারে, দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে এবং প্রতিশ্রুতিগুলোকে বাস্তব ও কল্যাণকর পদক্ষেপে রূপান্তর করতে।
(অনুবাদিত)
লেখক – নিকোলাস বিশ্বাস
একজন ফ্রিল্যান্স মিডিয়া কর্মী এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী।
